বিমান যাত্রার আদব-কায়দা: প্লেনে যাত্রার সময় কি করা উচিৎ এবং কি করা উচিৎ নয়?
এই লেখাটি এক বছরের বেশি আগে হালনাগাদ হয়েছে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি বা অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে সর্বশেষ তথ্য যাচাই করে নিন।
সাধারণত সবার ক্ষেত্রেই প্রথমবারের মতো উড়োজাহাজে বা বিমান ভ্রমণের সময় একটা অন্যরকম উত্তেজনা কাজ করে। আপনি যদি প্রথমবার বিমানে চড়ে থাকেন, তবে আপনার মনে এই রোমাঞ্চ কাজ করাটাই স্বাভাবিক। অনেকে আবার স্নায়বিক চাপ বা নার্ভাসনেসও অনুভব করেন, কারণ বিমানের পরিবেশ অন্যসব সাধারণ যানবাহন থেকে অনেকটাই আলাদা। এছাড়া বিমানে কিছু সুনির্দিষ্ট আদব-কেতা ও আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে চলতে হয়। তা না হলে নিজের অজান্তেই অন্য যাত্রীদের বিরক্তির কারণ হতে পারেন। তাই বিমান ভ্রমণের আগে জেনে নেওয়া দরকার প্লেনে যাত্রার সময় কি করা উচিৎ এবং কি করা উচিৎ নয়?
- ভ্রমণের প্রস্তুতি ও লাগেজের সঠিক ওজন নিশ্চিত করা জরুরি।
- এয়ারপোর্টের ইমিগ্রেশন ও নিরাপত্তা নিয়মাবলী কঠোরভাবে মেনে চলুন।
- প্লেনের ভেতরে সহযাত্রীদের ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্য ও শিষ্টাচার বজায় রাখুন।
প্রবাসীদের জন্য NRB ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার নিয়ম
বিদেশে বসেই নিজের নামে প্রবাসীদের বিশেষ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট (NRB, FC ও NFCD) খোলার সহজ উপায়, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও সঠিক ব্যাংক বাছাইয়ের গাইড।
বৈধ উপায়ে বাংলাদেশে টাকা পাঠানোর সহজ নিয়ম
ব্যাংকিং চ্যানেল ও অফিশিয়াল এক্সচেঞ্জ হাউজের মাধ্যমে দেশে টাকা পাঠানোর নিয়ম, ২.৫% প্রণোদনার শর্ত এবং হুন্ডি এড়িয়ে নিরাপদ লেনদেনের গাইড।
বিমান ভ্রমণের প্রস্তুতি নিবেন কীভাবে?
প্লেনে সাধারণত আমরা বিদেশ ভ্রমণ বা জরুরি কাজে যাতায়াত করে থাকি। বিভিন্ন জন বিভিন্ন কারণে এই যাত্রা করেন—কেউ চাকরির জন্য, কেউ ব্যবসার জন্য, কেউ ট্রাভেলের উদ্দেশ্যে আবার কেউ পড়াশোনার জন্য। আপনি কি কারণে ভ্রমণ করবেন তার ওপর নির্ভর করবে আপনার গুছিয়ে প্রস্তুতি নেওয়া। আপনি যদি নতুন এবং প্রথমবারের মতো বিদেশে চাকরি বা কোনো কাজের উদ্দেশ্যে যেতে চান, তবে নিচের প্রস্তুতিগুলো অবশ্যই বিবেচনা করুন:
- তালিকাবদ্ধ হোন: ভ্রমণের সময় আপনার সাথে যা যা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও কাগজপত্র নিতে হবে, তার একটি সুনির্দিষ্ট তালিকা তৈরি করুন।
- ক্যারি-অন ব্যাগ: যে ব্যাগটি প্লেনে আপনার নিজের কাছে (কেবিনে) রাখবেন, সেটিতে টাকা-পয়সা, গহনা, ভ্রমণ ও চাকরি সংক্রান্ত জরুরি কাগজপত্র রাখুন।
- চেক-ইন লাগেজ ওজন: বিমানে যে বড় ব্যাগটি কার্গো বা চেক-ইনে দেবেন, সেটি নির্দিষ্ট ওজনের মধ্যে রাখুন (সাধারণত ২০ কেজি বা এয়ারলাইন্সের নির্ধারিত সীমা)।
- ব্যাগ সুরক্ষা: ব্যাগটি অবশ্যই শক্তিশালী হতে হবে এবং প্রয়োজনে ভালো মানের তালা বা প্যাকিং টেপ দিয়ে শক্ত করে বেঁধে দিন। যাত্রাকালে ব্যাগ ছিঁড়ে গেলে বড় বিপাকে পড়তে পারেন।
- নাম ও ঠিকানা: ভ্রমণের সময় প্রতিটি ব্যাগের বাইরে ও ভেতরে আপনার নাম, বর্তমান ঠিকানা ও সচল ফোন নম্বর লিখে দিন।
- মূল্যবান জিনিস দূরে রাখুন: বিমানের লাগেজে যে বড় ব্যাগ দেবেন, তাতে কখনো টাকা-পয়সা, গহনা বা অতি মূল্যবান কাগজপত্র রাখবেন না।
- অপরিচিত ব্যক্তি: বিমানবন্দর বা যাত্রাপথে অপরিচিত কারো দেওয়া কোনো প্যাকেট বা বস্তু কখনোই নিজের ব্যাগে বহন করবেন না।
- ধারালো বস্তু নিষিদ্ধ: কখনোই ধারালো বস্তু যেমন—ব্লেড, কাঁচি, ছুরি ইত্যাদি কেবিন ব্যাগে নেবেন না। সিকিউরিটি চেকের সময় ধরা পড়লে এগুলো সঙ্গে সঙ্গে বাজেয়াপ্ত করা হয়।
যাত্রা সহজ ও মানসিক প্রশান্তির জন্য পড়তে পারেন: আপনার জীবনে অবকাশ কেন জরুরি তা কি জানেন? বিস্তারিত জানুন।
প্লেনের ভেতর ও এয়ারপোর্টে নিষিদ্ধ কাজসমূহ
আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল আইন ও এয়ারপোর্টের নিরাপত্তা বিধি অনুযায়ী কিছু কাজ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। প্লেনের ভেতরে বা এয়ারপোর্টে অবশ্যই এই বিষয়গুলো পরিহার করতে হবে:
- প্লেনে ও এয়ারপোর্টের নির্ধারিত ধূমপান জোন ছাড়া সব জায়গায় ধূমপান কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
- উড্ডয়ন ও অবতরণের সময় নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করুন।
- যেকোনো ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র, অস্ত্র ও বিস্ফোরকজাতীয় পদার্থ বহন করা আইনগত অপরাধ।
- আইনবহির্ভূত নিষিদ্ধ মাদক ও ড্রাগ বহন করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
- সহজে আগুন ধরে এমন পদার্থ (যেমন- লাইটার, গ্যাস সিলিন্ডার জাতীয় বস্তু) বহন নিষিদ্ধ।
- তীব্র দুর্গন্ধ ছড়ায় এমন কোনো খাদ্যদ্রব্য বা বস্তু নিয়ে বিমানে উঠবেন না।
- নির্দিষ্ট কিছু আন্তর্জাতিক রুটে তাজা মাংস, দুধ, ডিম ও পোল্ট্রিজাতীয় খাবার, কাঁচা ফলমূল বা শাকসবজি বহন করার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা থাকে।
এয়ারপোর্টের ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া কী?
সকল প্রস্তুতি শেষ করে নির্দিষ্ট তারিখে সময়ের আগে এয়ারপোর্ট কাউন্টারে পৌঁছান। বিমানে ওঠার আগে ইমিগ্রেশন ও সিকিউরিটি ভেরিফিকেশন সম্পন্ন করতে হয়। শুধুমাত্র বৈধ কাগজপত্রধারী যাত্রীরাই বিমানে ওঠার অনুমতি পেয়ে থাকেন।
আপনার পাসপোর্ট, ভিসা, টিকিটের বিবরণ এবং জনশক্তি ব্যুরোর ছাড়পত্র (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে) যাচাই করে সঠিক পেলে তবেই সিলমোহর দেওয়া হয়। ইমিগ্রেশনের লাইনে শৃঙ্খলা বজায় রেখে আপনার পাসপোর্ট, ভিসা, ডিসএম্বারকেশন বা ইমিগ্রেশন ফরম প্রস্তুত রাখুন। অফিসার আপনার পাসপোর্টে গমনের তারিখসহ এক্সিট সিল প্রদান করবেন।
প্লেনে উঠবেন যেভাবে
ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর ভেতরের লাউঞ্জে বিমানের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। বিমানের বোর্ডিংয়ের ঘোষণা ইংরেজিতে ও বাংলায় মাইক্রোফোনে জানানো হয়। এছাড়া ডিসপ্লে বোর্ড ও মনিটরের দিকেও সতর্ক দৃষ্টি রাখুন। ঘোষণার পরপরই বোর্ডিং পাস হাতে নিয়ে নির্দিষ্ট গেট দিয়ে বিমানের দিকে অগ্রসর হন এবং আপনার অ্যাসাইন করা সিটে গিয়ে বসুন।
বিমানের ভিতর করণীয় ও আদব-কায়দা
বিমান ভ্রমণ আরামদায়ক ও ঝামেলামুক্ত করতে হলে কিছু মৌলিক শিষ্টাচার মেনে চলা আবশ্যক। বিমানের ভেতর আপনার আচরণ কেমন হওয়া উচিত, তা নিচে আলোচনা করা হলো:
১. বিমানের শৌচাগার ব্যবহার
দীর্ঘ যাত্রায় বিমানের শৌচাগার ব্যবহারের প্রয়োজন হতেই পারে। তবে ভেতরে অতিরিক্ত সময় নেওয়া থেকে বিরত থাকুন, যাতে অন্য যাত্রীদের দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে না হয়। ঘরের শৌচাগারের মতো এটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখুন এবং ব্যবহারের পর যথাযথভাবে ফ্লাশ করুন।
২. তীব্র গন্ধযুক্ত পারফিউম বা খাবার পরিহার
অনেকের কাছে নির্দিষ্ট কোনো সুগন্ধি বা আতর পছন্দের হলেও অনেকেই তা সহ্য করতে পারেন না। তাই বিমানে ওঠার সময় অতিরিক্ত বা তীব্র গন্ধযুক্ত পারফিউম ব্যবহার না করাই ভালো। এর ফলে অন্য যাত্রীদের বমি ভাব বা শ্বাসকষ্টের সমস্যা হতে পারে। একইভাবে তীব্র গন্ধযুক্ত খাবার বা স্ন্যাকস সিটে বসে খাওয়া থেকে বিরত থাকুন।
৩. সন্তান ও শিশুদের প্রতি যত্নশীল হোন
ছোট বাচ্চারা অনেক সময় দীর্ঘ যাত্রায় কান্নাকাটি বা দুষ্টুমি করতে পারে, যা তাদের বয়সে স্বাভাবিক। অভিভাবক হিসেবে আপনার সন্তানকে শান্ত রাখার দায়িত্ব আপনারই। বিমানের ভেতর অন্য কারো সন্তান বিরক্ত করলে ধৈর্য ধরুন; কখনোই অন্যের সন্তানকে অযথা ধমক দিতে যাবেন না।
৪. প্লেনে ঘুমানোর সঠিক শিষ্টাচার
দীর্ঘ দূরত্বের ফ্লাইটে যাত্রীরা ঘুমিয়ে সময় কাটান। ঘুমানোর জন্য আপনি এয়ারলাইন্স থেকে নেক পিলো (ঘাড়ের বালিশ) ব্যবহার করতে পারেন। এর ফলে ঘুমের মধ্যে আপনার মাথা পাশের যাত্রীর কাঁধে পড়ে যাওয়ার বিড়ম্বনা এড়ানো যায়। আপনি যদি মাঝের সিটের যাত্রী হন, তবে ট্রে টেবিলে মাথা রেখে ঘুমানো থেকে বিরত থাকুন, কারণ এতে দুই পাশের যাত্রীদের চলাচলে বিঘ্ন ঘটে।
৫. মাঝের আসনের যাত্রীর আর্মরেস্টের অধিকার
বিমানের তিন আসনের সারিতে জানালার পাশের সিট বা করিডোরের সিটের তুলনায় মাঝের সিটের যাত্রীর নড়াচড়া ও হাত-পা ছড়িয়ে বসার সুযোগ কম থাকে। তাই শিষ্টাচার অনুযায়ী মাঝের আসনের যাত্রীকে দুই পাশের আর্মরেস্ট ব্যবহারের অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
৬. সঠিক সময়ে আসন ত্যাগ করুন
জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বিমানের ভেতর বারবার আসন ছেড়ে অযথা হাঁটাচলা করা উচিত নয়। বিশেষ করে বিমানবালারা যখন কেবিন ক্রুদের ট্রের মাধ্যমে খাবার পরিবেশন করেন, তখন করিডোর ফাঁকা রাখুন এবং নিজের আসনে অবস্থান করুন।
৭. মালপত্র (Luggage) সঠিকভাবে রাখুন
আসনের ওপরের ওভারহেড বিন (Bin) প্রতিটি যাত্রীর লাগেজ রাখার জন্য নির্ধারিত। ব্যাগগুলোকে আড়াআড়ি বা উলম্বভাবে রেখে সুনির্দিষ্ট জায়গা বাঁচিয়ে চলুন, যাতে অন্য যাত্রীরাও তাদের ব্যাগ রাখতে পারেন। ছোট হ্যান্ডব্যাগ বা ল্যাপটপ ব্যাগ সামনের সিটের নিচের জায়গায় রাখতে পারেন।
৮. সিট হেলানোর (Recline) ক্ষেত্রে সতর্কতা
আপনি চাইলে সিট পেছনে হেলিয়ে কিছুটা আরাম করে বসতে পারেন। তবে সিটটি বাঁকানোর আগে পেছনের যাত্রীর দিকে খেয়াল রাখুন। হুট করে সিট পেছনে নামিয়ে দিলে পেছনের যাত্রীর ল্যাপটপ, ড্রিংকস বা হাঁটুতে আঘাত লাগতে পারে। তাই সিট বাঁকানোর পূর্বে পেছনের যাত্রীকে সামান্য সতর্ক করে নেওয়া ভদ্রতা।
৯. কেবিন ক্রু বা বিমানবালাদের সাথে ভালো আচরণ
বিমানবালা ও কেবিন ক্রুরা আপনার নিরাপত্তা ও সেবার জন্য নিয়োজিত। সিট বেল্ট বাঁধা, খাবার পরিবেশন বা জরুরি নির্দেশনা প্রদানে তারা আপনাকে সাহায্য করেন। তাদের সাথে সবসময় মার্জিত ও ভালো আচরণ করুন। আপনার খারাপ আচরণে ফ্লাইট পরিচালনার স্বাভাবিক কার্যক্রমেও ব্যাঘাত ঘটতে পারে।
বিদেশ পৌঁছানোর পর বিমান বন্দরে করণীয় কী?
গন্তব্য দেশের এয়ারপোর্টে পৌঁছানোর পর আপনার প্রথম ও প্রধান কাজ হলো চেক-ইন লাগেজ বা ব্যাগ সঠিকভাবে সংগ্রহ করা। ব্যাগেজ ক্লাইম বা কনভেয়ার বেল্টের সামনে গিয়ে অপেক্ষা করুন। মনিটরে আপনার ফ্লাইট নম্বর ও বেল্ট নম্বর মিলিয়ে আপনার ব্যাগ সংগ্রহ করুন। কাস্টমস চেকিংয়ের সময় কাস্টমস ডিক্লারেশন ফরম জমা দিন এবং অফিসার দেখতে চাইলে ব্যাগ খুলে সহযোগিতা করুন।
হারানো ব্যাগ খুঁজবেন যেভাবে
কনভেয়ার বেল্ট থেকে লাগেজ না পেলে বা হারিয়ে গেলে আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত এয়ারলাইন্স কোম্পানির হারিয়ে যাওয়া লাগেজ কাউন্টারে (Lost and Found Counter) যোগাযোগ করুন এবং ক্লেইম ফরম পূরণ করুন। আপনার টিকেটের ট্যাগ নম্বর ও হোটেলের বা গন্তব্যের সঠিক ঠিকানা ও ফোন নম্বর কর্তৃপক্ষকে প্রদান করুন। এয়ারলাইন্স সাধারণত ব্যাগ খুঁজে বের করে আপনার ঠিকানায় পৌঁছে দেয়। ব্যাগ না পাওয়া গেলে আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন নীতিমালা অনুযায়ী আপনাকে নির্দিষ্ট ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে।
এই লেখা সাধারণ তথ্যের জন্য। সরকারি নিয়ম, ফি ও সেবা বদলাতে পারে; স্বাস্থ্য বা আইনি বিষয়ে সিদ্ধান্তের আগে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা অফিসিয়াল সূত্রে যাচাই করে নিন।

কোন মন্তব্য নেই: