Home BD Infoনাগরিক সেবা, ব্যাংকিং ও প্রযুক্তির বাংলা গাইড

ABC লাইসেন্স কী? ইলেকট্রিক্যাল সুপারভাইজার লাইসেন্সের যোগ্যতা, ফি ও আবেদনের নিয়ম

ইলেকট্রিক্যাল পেশায় ক্যারিয়ার গড়তে চাইলে ABC লাইসেন্স নামটি আপনি শুনে থাকবেন। সাধারণ ভাষায় এটিই বৈদ্যুতিক সুপারভাইজার লাইসেন্স, যা সরকারি সনদ হিসেবে স্বীকৃত। এই লেখায় আমরা দেখব, ABC লাইসেন্স আসলে কী, কারা আবেদন করতে পারেন, কত ফি লাগে এবং অনলাইনে আবেদন করবেন কীভাবে।

ABC লাইসেন্স কী? ইলেকট্রিক্যাল সুপারভাইজার লাইসেন্স কীভাবে পাবেন

সর্বশেষ হালনাগাদ: ২১ অক্টোবর ২০২৬

সংক্ষেপে উত্তর: ABC লাইসেন্সের কোনো পূর্ণরূপ নেই। A, B ও C হলো লাইসেন্সের শ্রেণি। এটি প্রধান বিদ্যুৎ পরিদর্শকের দপ্তর থেকে পরীক্ষার মাধ্যমে দেওয়া হয় এবং আবেদন করতে হয় দপ্তরের ই-সার্ভিস পোর্টালে। সুপারভাইজার পরীক্ষার জন্য প্রকৌশলী হিসেবে বৈদ্যুতিক কাজের অভিজ্ঞতা লাগে। আবেদনের আগে দপ্তরের নোটিশ বোর্ড দেখে নিন, কারণ নিয়ম ও ফি বদলাতে পারে।

ABC লাইসেন্স কী এবং A, B, C শ্রেণি বলতে কী বোঝায়?

ABC লাইসেন্স মূলত বৈদ্যুতিক সুপারভাইজার লাইসেন্স। দপ্তরের ভাষায় একে সুপারভাইজার কম্পিটেন্সি সার্টিফিকেটও বলা হয়। এটি দেন প্রধান বিদ্যুৎ পরিদর্শকের দপ্তর, যা বিদ্যুৎ বিভাগের অধীন একটি সরকারি দপ্তর। আগে এর নাম ছিল বৈদ্যুতিক উপদেষ্টা ও প্রধান বিদ্যুৎ পরিদর্শকের দপ্তর। এ কারণে পুরোনো লেখা বা ওয়েবসাইটে আপনি দুই রকম নামই দেখতে পাবেন (দপ্তর পরিচিতি)।

A, B ও C হলো কাজের ধরন ও পরিসর অনুযায়ী শ্রেণি। সাধারণভাবে বোঝার জন্য:

  • C: বেসিক বৈদ্যুতিক কাজ, যেমন বাড়ির ওয়্যারিং।
  • B: মোটর ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল কন্ট্রোলের মতো তুলনামূলক বড় কাজ।
  • A: সাবস্টেশন ও উচ্চ ক্ষমতার বৈদ্যুতিক স্থাপনা সংক্রান্ত কাজ।

প্রতিটি শ্রেণিতে কাজের সুনির্দিষ্ট পরিসর আইন ও বিধিমালায় নির্ধারিত। তাই কোন শ্রেণি আপনার দরকার, তা ঠিক করার আগে দপ্তরের নিয়মাবলি দেখে নিন।

দপ্তরের বর্তমান ফি তালিকায় A, B, C এবং AB, BC, ABC সমন্বয় আলাদা আলাদা শ্রেণি হিসেবে দেখানো আছে। অর্থাৎ আপনি এক বা একাধিক শ্রেণির জন্য একসঙ্গে আবেদন করতে পারেন। পুরোনো অনেক লেখায় বলা হতো, C ছাড়া B বা B ছাড়া A নেওয়া যায় না। দপ্তরের বর্তমান তালিকায় তেমন কোনো শর্ত দেখা যায় না, তাই আবেদনের সময় পোর্টালের ফরমে যা দেখাবে সেটাই অনুসরণ করুন।

দপ্তর থেকে কোন কোন লাইসেন্স দেওয়া হয়?

ধরনকাদের জন্যআবেদনের নিয়মাবলি
ইলেকট্রিশিয়ানবৈদ্যুতিক কারিগরি পেশায় নিয়োজিত দক্ষ কর্মীদপ্তরের নিয়মাবলি
সুপারভাইজার (ABC)প্রকৌশলী ও অভিজ্ঞ কারিগরি জনবলদপ্তরের নিয়মাবলি
ঠিকাদারবৈদ্যুতিক ঠিকাদারি ব্যবসা করতে ইচ্ছুকদপ্তরের নিয়মাবলি

ঠিকাদারি ব্যবসা করতে হলে সুপারভাইজার লাইসেন্স যথেষ্ট নয়। আলাদা বৈদ্যুতিক ঠিকাদারি লাইসেন্স লাগে। আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক ধরনের জন্য আবেদন করুন।

আবেদনের যোগ্যতা ও প্রয়োজনীয় কাগজ

দপ্তরের সুপারভাইজার লাইসেন্সের আবেদন-নিয়মাবলি অনুযায়ী শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার শর্ত নিচের মতো। প্রতিটি ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা হতে হবে প্রকৌশলী হিসেবে বৈদ্যুতিক কাজের।

শিক্ষাগত যোগ্যতান্যূনতম অভিজ্ঞতা
বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং (ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক্স)১ বছর
বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং (ইলেকট্রনিক্স ও কমিউনিকেশন, মেকানিক্যাল, সিভিল ইত্যাদি অন্যান্য বিষয়)৩ বছর
ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং (ইলেকট্রিক্যাল)৩ বছর
ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং (ইলেকট্রনিক্স, মেকানিক্যাল, পাওয়ার, সিভিল ইত্যাদি অন্যান্য বিষয়)৫ বছর

অনলাইন আবেদনের সঙ্গে সংযুক্ত করতে হয়:

  • ফি জমার চালানের মূল কপি
  • শিক্ষাগত যোগ্যতার (ইঞ্জিনিয়ারিং সনদ) তথ্য
  • প্রকৌশলী হিসেবে বৈদ্যুতিক কাজের অভিজ্ঞতার প্রমাণ
  • জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) নম্বর
  • আবেদনকারীর স্বাক্ষর ও ছবি

আবেদনে মিথ্যা তথ্য দিলে আবেদন বাতিল হয় এবং আইনি ব্যবস্থাও নেওয়া হতে পারে। অসম্পূর্ণ আবেদন গ্রহণ করা হয় না। এই শর্তগুলো সময়ে সময়ে বদলাতে পারে, তাই আবেদনের আগে দপ্তরের সর্বশেষ নিয়মাবলি একবার মিলিয়ে নিন।

সুপারভাইজার লাইসেন্স পরীক্ষার ফি

দপ্তরের প্রকাশিত নিয়মাবলিতে শ্রেণি অনুযায়ী পরীক্ষার ফি ও সেন্টার ফি আলাদাভাবে দেওয়া আছে:

শ্রেণিপরীক্ষার ফিসেন্টার ফি
C১,০০০ টাকা৫০০ টাকা
B১,৫০০ টাকা৫০০ টাকা
A২,০০০ টাকা৫০০ টাকা
BC২,৫০০ টাকা১,০০০ টাকা
AB৩,৫০০ টাকা১,০০০ টাকা
ABC৪,৫০০ টাকা১,৫০০ টাকা

পরীক্ষার ফি ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে দিতে হয়। চালান কীভাবে কাজ করে, তা জানতে পড়ুন ই-চালানে সরকারি ফি জমা দেওয়ার নিয়ম। সেন্টার ফি অনলাইনে মোবাইল ব্যাংকিং (বিকাশ, নগদ, রকেট) বা ডেবিট/ক্রেডিট কার্ডে দেওয়া যায়। ফি বদলাতে পারে, তাই জমার আগে দপ্তরের লাইসেন্স ফি ক্যালকুলেটরে নিজের ফি যাচাই করে নিন।

অনলাইনে আবেদনের ধাপ

বর্তমানে আবেদন করতে হয় দপ্তরের ই-সার্ভিস পোর্টালে। পোর্টালের ধাপগুলো সময়ের সঙ্গে বদলাতে পারে, তাই নিচের ধাপগুলোকে সাধারণ নির্দেশনা হিসেবে নিন এবং পোর্টালের নির্দেশনার সঙ্গে মিলিয়ে চলুন।

  1. রেজিস্ট্রেশন ও লগইন: পোর্টালে মোবাইল নম্বর বা ইমেইল দিয়ে নিবন্ধন করুন। আগে নিবন্ধন করা থাকলে সেই তথ্য দিয়েই লগইন করুন। একই মোবাইল নম্বর বা ইমেইলে একাধিক নিবন্ধন সাধারণত হয় না।
  2. ফরম নির্বাচন: ড্যাশবোর্ড থেকে সুপারভাইজার লাইসেন্সের আবেদন ফরম খুলুন এবং শ্রেণি (A, B, C বা সমন্বয়) নির্বাচন করুন।
  3. ফি পরিশোধ: ক্যালকুলেটরে ফি দেখে নিয়ে ট্রেজারি চালানে পরীক্ষার ফি জমা দিন। চালানের তথ্য ও স্ক্যান কপি ফরমে যুক্ত করুন।
  4. সেন্টার ফি: অনলাইনে পরিশোধ করুন।
  5. কাগজপত্র যুক্ত করা: সনদ, অভিজ্ঞতার তথ্য, এনআইডি নম্বর, ছবি ও স্বাক্ষর আপলোড করুন।
  6. চূড়ান্ত জমা: ফাইনাল সাবমিটের আগে সব তথ্য ভালো করে মিলিয়ে নিন। চূড়ান্ত জমার পর তথ্য সংশোধনের সুযোগ সাধারণত থাকে না।

ফি ভুলভাবে জমা হলে তা ফেরত না-ও পেতে পারেন, তাই চালান ও ফির অঙ্ক দুবার মিলিয়ে নিন।

পরীক্ষা ও ফল

দপ্তর বিদ্যুৎ লাইসেন্সিং বোর্ডের মাধ্যমে পরীক্ষা নেয়। পরীক্ষার তারিখ ও সময় আবেদনকারীকে জানানো হয় এবং নোটিশ বোর্ডেও প্রকাশ করা হয়। আগে বছরে কয়েকবার বিজ্ঞপ্তি আসত, তবে কোন লাইসেন্সের আবেদন কখন চলবে, তা প্রতিবছর বদলাতে পারে। পুরোনো লেখার তারিখের ওপর ভরসা না করে সরাসরি দপ্তরের ওয়েবসাইটের নোটিশ বোর্ড দেখুন।

সুপারভাইজার পরীক্ষার ফল দপ্তরের ওয়েবসাইটে দৈনিক ফলাফল হিসেবে প্রকাশ করা হয়।

সাম্প্রতিক পরিবর্তন: ২০২৬ সালের ১৯ অক্টোবর দপ্তরের নোটিশ বোর্ডে বিদ্যুৎ লাইসেন্সিং বোর্ড বিধিমালা ২০২২ এবং বিদ্যুৎ বিধিমালা ২০২০ সংশোধনের গেজেট প্রকাশিত হয়েছে। আবেদনের আগে নতুন শর্ত আছে কি না, তা নোটিশে দেখে নিন।

লাইসেন্স দিয়ে কী করা যায়, কী করা উচিত নয়

সুবিধা: সরকার স্বীকৃত এই সনদ থাকলে চাকরির আবেদনে আপনার কারিগরি যোগ্যতার প্রমাণ হিসেবে তা দেখানো যায়। অনেক প্রতিষ্ঠান বৈদ্যুতিক কাজের তদারকিতে এই সনদধারী লোক চায়। দপ্তরের ওয়েবসাইটে সনদপ্রাপ্তদের তালিকাও থাকে, যা নিয়োগকর্তারা যাচাই করে দেখতে পারেন (সুপারভাইজারদের তালিকা)।

ঠিকাদারি ব্যবসা: এ জন্য আলাদা ঠিকাদারি লাইসেন্স দরকার। ব্যবসা শুরু করলে ট্রেড লাইসেন্স ও টিনও লাগে। বিস্তারিত দেখুন: ট্রেড লাইসেন্স কী ও কীভাবে নেবেন এবং ই-টিন করার নিয়ম।

লাইসেন্স ভাড়া দেবেন না: অনেকে বলেন, নিজে কাজ না করলে লাইসেন্স অন্যকে ভাড়া দেওয়া যায়। এ পরামর্শ মানা ঠিক নয়। লাইসেন্স আপনার ব্যক্তিগত দক্ষতার সনদ। অন্য কেউ আপনার নামে কাজ করলে বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনা বা আইনি জটিলতার দায় আপনার ওপরও পড়তে পারে। এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে সরাসরি দপ্তরের সঙ্গে কথা বলুন।

প্রতারণা থেকে সাবধান: দপ্তর নিজেই সতর্ক করেছে, অবৈধ উপায়ে লাইসেন্স পাওয়া বা নবায়ন করে দেওয়ার কথা বলে কেউ টাকা চাইলে লেনদেন করবেন না। নিয়ম মেনে অনলাইনে আবেদন করে পরীক্ষা দিন এবং ফি অনলাইনে নির্ধারিত পথেই দিন।

পরীক্ষার প্রস্তুতি

দপ্তরের বিজ্ঞপ্তি ও নোটিশে পরীক্ষার ধরন ও বিষয় সম্পর্কে নির্দেশনা থাকে। সাধারণভাবে নিচের বিষয়গুলো ভালো করে জানা থাকলে প্রস্তুতি সহজ হয়।

  • C শ্রেণির জন্য: হাউজ ওয়্যারিং, সুইচ ও তারের সাইজ, ক্যাপাসিটর, মিটার ও মাপার যন্ত্র (মেগার, এভিও মিটার, ক্ল্যাম্প মিটার)।
  • B শ্রেণির জন্য: সিঙ্গেল ও থ্রি ফেজ মোটর, স্টার-ডেল্টা, ডিওএল স্টার্টার, ফরোয়ার্ড-রিভার্স কানেকশন, কন্ট্রোল সার্কিট।
  • A শ্রেণির জন্য: ট্রান্সফরমার, সাবস্টেশন, এইচটি ও এলটি প্যানেল, সার্কিট ব্রেকার (ভিসিবি, এসিবি), সিটি ও পিটি, ইনসুলেটর, পিএফআই প্যানেল।
  • সব শ্রেণির জন্য: আর্থ টেস্টার, জেনারেটর, সুইচগিয়ার, রিলে, পাওয়ার ফ্যাক্টর, নিরাপত্তা সরঞ্জাম ও বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার প্রাথমিক ধারণা।

সাধারণ প্রশ্নোত্তর

ABC লাইসেন্সের পূর্ণরূপ কী?

কোনো পূর্ণরূপ নেই। A, B ও C হলো কাজের পরিসর অনুযায়ী লাইসেন্সের শ্রেণি।

ফ্রেশার কি সুপারভাইজার লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে পারেন?

দপ্তরের বর্তমান নিয়মাবলিতে বৈদ্যুতিক কাজের ন্যূনতম অভিজ্ঞতার শর্ত আছে (১ থেকে ৫ বছর, শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী)। অভিজ্ঞতা ছাড়া আবেদন করলে সফল না-ও হতে পারে।

কোথায় আবেদন করতে হয়?

প্রধান বিদ্যুৎ পরিদর্শকের দপ্তরের ই-সার্ভিস পোর্টালে। এখন সাধারণত অনলাইনেই আবেদন নেওয়া হয়।

ফি কত?

শ্রেণি অনুযায়ী ফি আলাদা। উপরের সারণি দেখুন, তবে জমার আগে দপ্তরের ফি ক্যালকুলেটরে যাচাই করে নিন।

সার্টিফিকেট বা লাইসেন্স সত্যি কি না যাচাই করা যায় কীভাবে?

দপ্তরের ই-সার্ভিস পোর্টালে ইলেকট্রিশিয়ান, সুপারভাইজার ও ঠিকাদারদের তালিকা আছে। সেখানে দেখে নিতে পারেন।

শেষ কথা

ABC লাইসেন্স পেতে হলে সঠিক যোগ্যতা, প্রয়োজনীয় কাগজ ও দপ্তরের নির্ধারিত পথে আবেদন করা জরুরি। কারও মাধ্যমে "সহজে লাইসেন্স করে দেওয়ার" প্রস্তাবে সাড়া না দিয়ে নিজে অনলাইনে আবেদন করুন। আবেদনের আগে অবশ্যই দপ্তরের নোটিশ বোর্ড দেখুন, কারণ নিয়ম, ফি ও সময়সূচি বদলাতে পারে।

দাবিত্যাগ: এই লেখা সাধারণ তথ্যের জন্য, দপ্তরের সরকারি নিয়মাবলির বিকল্প নয়। আবেদনের আগে প্রধান বিদ্যুৎ পরিদর্শকের দপ্তরের সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি ও নিয়মাবলি দেখে নিন।

আরও জানুন

এই লেখা সাধারণ তথ্যের জন্য। সরকারি নিয়ম, ফি ও সেবা বদলাতে পারে; স্বাস্থ্য বা আইনি বিষয়ে সিদ্ধান্তের আগে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা অফিসিয়াল সূত্রে যাচাই করে নিন।

কোন মন্তব্য নেই:

Blogger দ্বারা পরিচালিত.