গ্রেপ্তার করতে আসা পুলিশ ভূয়া কিনা কিভাবে বুঝবেন?

বাংলাদেশে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে ভূয়া পুলিশ, ভূয়া র‌্যাব কিংবা ডিবি পুলিশের খবর প্রকাশিত হয়ে থাকে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনী দ্বারা এই ভূয়া সদস্যদের গ্রেপ্তার করার ঘটনাও সংবাদ মাধ্যমে পাওয়া যায়। অনেক সময় এমনও হয় যে, অপহরণকারীরা ভূয়া পুলিশ/ র‌্যাব কিংবা ডিবির পরিচয় দিয়ে কাউকে তুলে নিয়ে গিয়ে মুক্তিপণ দাবি করে কিংবা হত্যা করে। তাই আপনার মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে, আটক করতে আসা লোকগুলো সত্যিই পুলিশ কিনা কিভাবে জানবো? এটা শুধু আপনার মনের প্রশ্ন নয়, সকল নাগরিকদের মনে এমন প্রশ্ন আসা অস্বাভাবিক নয়।

গ্রেপ্তার করতে আসা পুলিশ ভূয়া কিনা কিভাবে বুঝবেন?

অনেক সময় সাদা পোশাকে গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটে থাকে। সাদা পোশাকধারী সত্যিকারে কোন বাহিনীর লোক কিনা তা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন আটক হওয়ার সময়ই। এই বিষয়ে বিবিসি বাংলা একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিলো “কীভাবে বুঝবেন আটক করতে আসা ব্যাক্তিরা সত্যিই পুলিশ কিনা?” লিংক- https://www.bbc.com/bengali/news-60189247


পুলিশের হয়রানির শিকার হলে কোথায় কিভাবে অভিযোগ করবেন?

 

অপরাধীরা বাহিনী সেজে ভূয়া পরিচয় দেয় কেন?

আইনের প্রতি সকল মানুষের একটি দুর্বলতা রয়েছে। আর এই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে অপরাধীরা অপরাধ করে বসে। যেমন- ভূয়া খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা সেজে বিভিন্ন হোটেল, রেস্তরায় গিয়ে জরিমানা করার সংবাদও আমরা জেনেছি।

এছাড়াও পুলিশ বা ডিবি পরিচয়ে কাউকে তুলে নিয়ে গিয়ে মুক্তিপন দাবি বা হত্যার খবরও আমরা অনেক আগেই শুনেছি। এই বিষয়ে বিস্তারিত বোঝার জন্য বিবিসি বাংলা প্রতিবেদনের কিছু অংশ হুবহু তুলে ধরা হলো।

”বাংলাদেশে পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে মানুষজনকে ধরে নিয়ে যাওয়া বা অপহরণের অভিযোগ প্রায়ই ওঠে। অনেক সময় এভাবে অপহরণের পর মুক্তিপণ দাবি করা হয় বা হত্যা করা হয়। আবার অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে রেয়ার বেশ কিছুদিন পর তাদের বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।”

 

বাহিনীর ভূয়া পরিচয়ে অপহরণ বা গুম হলে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়

যদি সত্যিকারে পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করে তাহলে সমাজে কোন আতঙ্ক সৃষ্টি হওয়ার সম্ভবনা নেই। কেননা কি কারণে তাকে আটক করা হচ্ছে, তারা সত্যিকারের পুলিশ কিনা তা আটক ব্যাক্তির স্বজনরা সহ এলাকার অনেকজন জানতে পারে।

আতঙ্ক বা ভয় শুধু তখনই সৃষ্টি হয় যখন আটক ব্যক্তি তার স্বজনরা জানে না যে কি কারণে তাকে আটক করা হচ্ছে এবং যারা তাকে আটক করছে তারা আসলে সত্যিকারের পুলিশ কিনা?

তাই এই ব্যাপারে সবাইকে সচেতন হতে হবে এবং জানতে হবে কাউকে গ্রেপ্তার বা আটকের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য কি কি নিয়ম রয়েছে? যারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয় দিচ্ছে তারা সত্যিই পুলিশ কিংবা র‌্যাবের সদস্য কিনা তা কিভাবে নিশ্চিত হওয়া যাবে?

 

কোন সময় কি কারণে পুলিশ গ্রেপ্তার করতে পারে?

বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যে কাউকে আটক বা গ্রেপ্তার করতে পারে। যেমন- কোন অপরাধে হাতেনাতে ধরলে, তদন্তে প্রমাণ বা সম্পৃক্ততা পেলে, আইন ভঙ্গের অভিযোগ উঠলে বা মামলা হলে ।

আদালতের নির্দেশনা থাকলেও পুলিশ কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাউকে গ্রেপ্তার বা আটক করতে পারে। এছাড়াও কোন ব্যক্তির কর্মকান্ড সন্দেহজনক অথবা রাষ্ট্র ও জনগণের জন্য ক্ষতিকর মনে করলে পুলিশ ৫৪ ধারা অনুযায়ী আটক বা গ্রেপ্তার করতে পারে।

 

 গ্রেপ্তার বা আটকের প্রকারগুলো কি কি?

পুলিশ কয়েকভাবে আটক করতে পারে। এর মধ্যে একটি হলো আদালতের নির্দেশনায়। এছাড়া কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ কিংবা মামলা থাকলে কিংবা কোন অপরাধের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে এবং তদন্তে কোন অপরাধের সথে জড়িত থাকার তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেলে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার বা আটক করতে পারে।

গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছাড়াই পুলিশ আটক করতে পারে যে কারণে তা হচ্ছে- হত্যা, অপহরণ, চুরি, ছিনতাই, ডাকাতির মতো অপরাধে কেউ জড়িত থাকলে ঘটনাস্থলে কোন মামলা কিংবা ওয়ারেন্ট বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছাড়াই আটক করতে পারে।

আবার কোন অপরাধের বা মামলার তদন্তে কারও নাম ও সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে পরবর্তীতেও তাকে গ্রেপ্তার করতে পারে পুলিশ।

 

আটক বা গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির অধিকার কি?

মনে করুন আপনাকে পুলিশ গ্রেপ্তার করতে আসছে। এখন আপনার অধিকার কি? আইন অনুযায়ী আপনাকে কেন গ্রেপ্তার করা হচ্ছে এবং আপনার বিরুদ্ধে কি অভিযোগ আছে তা পুলিশ আপনাকে জনাবে।

এছাড়াও আটক বা গ্রেপ্তার করতে আসা ব্যাক্তিরা সত্যিকারের পুলিশ প্রমাণ করতে হবে। তারা সত্যিকারের পুলিশ না হলে, তাদের আটক করে সংশ্লিষ্ট থানায় খরব দেয়া সেখানে উপস্থিত জনতার সুযোগ বা অধিকার রয়েছে।

ভূয়া পুলিশ সেজে যদি এরকম অপরাধ চোখের সামনে ঘটে তাহলে জনতাও তাদের গ্রেপ্তার করতে পারে।  কেননা আইন সবার জন্য সমান, আইনশৃঙ্খলার বাহিনী বলে তারা যে আইনের উর্দ্ধে তা কিন্তু নয়।

সিআরপিসির ৮০ ধারা অনুযায়ী কাউকে গ্রেপ্তারের সময় অভিযুক্ত ব্যক্তি তার বিরুদ্ধে পরোয়ানা দেখতে চাইতে পারেন, এটা ওই ব্যক্তির অধিকার। তবে মনে রাখুন ওয়ারেন্ট ছাড়াও পুলিশ গ্রেপ্তার করতে পারে।

 

বাংলাদেশ সংবিধানে গ্রেপ্তারের ব্যাপারে কি আছে?

সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিকে কারণ না জানিয়ে আটক রাখা যাবে না এবং আটক ব্যক্তিকে তার মনোনীত আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করা ও আত্নপক্ষ সমর্থনের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।

এছাড়াও বাংলাদেশের সংবিধানে বলা হয়েছে, যতক্ষণ না সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ না হচ্ছে যে, তিনি অপরাধী ততক্ষণ আসলে তিনি নির্দোষ।

 

গ্রেপ্তার বা আটক হওয়ার কিছু বিধি বিধান

গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিকে ২৪ ঘন্টর মধ্যে অবশ্যই হাজির করতে হবে। তারপর তাকে আটক বা গ্রেপ্তার রাখতে হলে ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতিতে আটক রাখতে হব।

গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে আসার সাথে সাথে যত দ্রুত সম্ভব এই গ্রেপ্তারের ব্যাপারে অভিযোগ লিখে রাখতে হবে। অপরাধের বিস্তারিত বিবরণ, স্থানের বর্ণনা, গ্রেপ্তারের সময়কাল ডায়রিতে লিখে রাখতে হবে। আটক ব্যক্তির শরীরে আঘাতের কোন চিহ্ন থাকলে সেটাও লিখে রাখতে হবে। অভিযুক্ত ব্যক্তিকে থানায় আনার তিন ঘন্টার মধ্যে থানায় আনার অভিযোগ পত্র পেশ করতে হবে।

যত দ্রুত সম্ভব, গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিদের স্বজনদের জানাতে হবে যে, কোন থানায় কেন তাকে আটক রাখা হচ্ছে। এছাড়া গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে আইনগত পরামর্শ করার জন্য সুযোগ দিতে হবে।

এই বিধানগুলোর ব্যত্যয় ঘটলে অর্থাৎ কেউ যদি এই বিধানগুলো না মানেন তাহলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার জন্য তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ রয়েছে।

 

গ্রেপ্তার করতে আসা ব্যক্তিগুলো সত্যিই পুলিশ কিনা বোঝার উপায়

পুলিশ আটক বা গ্রেপ্তার করে কিভাবে তা উপরে আলোচনা করা হযেছে। গ্রেপ্তার করতে আসা ব্যক্তিগুলোর ব্যাপারে সন্দেহ হলে আপনার থানায় ফোন দিয়ে জেনে নিতে পারেন, তারা থানা থেকে আসছেন কিনা? এছাড়াও নিজের পদক্ষেপগুলো নিতে পারেন।

** আটক করতে আসা ব্যাক্তিদের পোশাক যাচাই করা

** সাদা পোশাকে গ্রেপ্তার করতে আসলে করণীয় কি?

** স্থানীয় থানা পুলিশ বা ৯৯৯ নাম্বারের সহায়তা নেওয়া ইত্যাদি।

 

পোশাক যাচাই করার ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলো দেখবেন?

ভূয়া পুলিশ বা র‌্যাব গ্রেপ্তার করতে আসলে তাদের পোশাক দেখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মতোই হলেও কিছু অমিল খুঁজে পাবেন। এক্ষেত্রে যে বিষয়গুলো দেখতে পারেন তা হচ্ছে-

** আটক করতে আসা ব্যক্তিদের ইউনিফর্ম দেখতে হবে সেটা ঠিক মত আছে কিনা?

** তার নেমপ্লেট আছে কিনা?

** কাঁধে র‌্যাংক বা ব্যাজ ঠিকমতো আছে কিনা? ভূয়া ব্যক্তিদের সাধারণত কাঁধে র‌্যাংক ঠিক মতো থাকে না, হয়তো দেখা যাবে সাধারণ একজন ব্যক্তির ঘাড়ে বড় কোন অফিসারের র‌্যাংক আছে। এগুলো দেখে আপনার সন্দেহ হতে পারে।

** তাদের আচরণ, কথাবার্তার ধরণ পেশাদার বাহিনীর সদস্যদের মতো কিনা লক্ষ রাখতে পারেন।

** কোন প্রকার সন্দেহ হলে পরিবার, আশেপাশে থাকা মানুষজন কিংবা অন্যদের সহায়তা নিতে পারেন।

এজন্য কোন বাহিনীর কি ধরণের পোশাক পরিধান করে তার বিস্তারিত আগে থেকে জানা প্রয়োজন। অনেকেরই পোশাক সম্পর্কে ধারণা থাকলেও পোশাকের বিভিন্ন ধরণ কিংবা একজন বাহিনী কর্মকর্তার পোশাকে কি কি লেবেল থাকে তা হয়তো জানা থাকে না।

সুতরাং যে কোন ধরণের সন্দেহ হলে সংশ্লিষ্ট থানায় যোগাযোগ করে গ্রেপ্তারের ব্যাপারে নিশ্চিত হবেন।


সাদা পোশাকে গ্রেপ্তার করতে আসলে কি করবেন?

অনেক সময় সাদা পোশাকে গ্রেপ্তারের খবর শুনে থাকবেন। যদিও এটি নিয়ে অনেক সমালোচনা হয়েছে। তবে আইন অনুযায়ী সাদা পোশাকধারী তাদের পরিচয় নিশ্চিত করতে বাধ্য।

কেননা কোন বাহিনী তাদের পরিচয় গোপন করে কাউকে আটক করার বিধান নেই। তারপরও তারা যদি তাদের পরিচয় দিতে অস্বীকার করে তাহলে থানায় যোগাযোগ করে নিশ্চিত হতে পারেন।

তারা কোন থানা থেকে এসেছে? তাদের টিম প্রধানের নাম কি? প্রয়োজনে তাদের ভিডিও করে রাখা যেতে পারে।

 

স্থানীয় থানা পুলিশ বা ৯৯৯ নাম্বারের সহায়তা

আটক করতে আসা ব্যক্তিদের ব্যাপারে যদি আপনার সন্দেহ হয়, তাহলে স্থানীয় থানায় যোগাযোগ করতে ভুলবেন না। এজন্য জরুরী সেবা ৯৯৯ নম্বরের সহায়তা নিতে পারেন।

আপনাকে যারা আটক করতে আসছে তাদের ব্যাপারে নিশ্চিত হতে জরুরী সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন দিয়ে সাহায়তা নিতে পারেন।

এক্ষেত্রে তারা কোন থানা থেকে এসেছে এবং তাদের টিম প্রধানের নাম জেনে নেওয়া যেতে পারে।

 

শেষকথা:

সমাজের মানুষ যখন সচেতন হবে এবং সৎ মানুষের উপস্থিতি বৃদ্ধি পাবে তখন সমাজের অপরাধ খুব কম সংঘটিত হবে কিংবা অপরাধ সমাজ থেকে বিদায় নিবে। অপরাধীরা যেন ভূয়া বাহিনী সেজে অপরাধ করতে না পারে সেজন্য সবাইকে সচেতন হতে হবে।

কোন মন্তব্য নেই:

Blogger দ্বারা পরিচালিত.