পরিত্র রমজান মাসে কি কি কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখবেন?

বছরের শ্রেষ্ট মাস হচ্ছে রমজান মাস। এই মাসে আল্লাহ তায়ালা মুসলিম উম্মাহর প্রতি বিশেষ নেয়ামত ও অনুকম্পা দান করেন। সকল মুসলিম উম্মাহর উচিৎ রমজান মাসে বেশি বেশি করে ভাল কাজ করা এবং অধিক পরিমানে আল্লাহকে স্বরণ করা। এতে অধিক সওয়াবের স্বাদ পাওয়া যাবে। এছাড়াও রমজান মাসের সুফল পূর্ণ রুপে পেতে হলে আপনাকে অবশ্যই কিছু কাজ থেকে নিজে বিরত রাখতে হবে। আজকে "পরিত্র রমজান মাসে কি কি কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখবেন?" সেই বিষয়ে আলাচনা করবো।

পরিত্র রমজান মাসে কি কি কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখবেন?


বছরের অন্যান্য মাসের চেয়ে এই মাসে ভাল কাজ করলে দ্বিগুণ সওয়াব লাভ করা যায়। ইবাদত বন্দেগীতে পূর্ণতা পেতে হলে এমন কিছু কাজ রয়েছে তা থেকে বিরত থাকতে হবে। অর্থাৎ কিছু কাজ এই রমজান মাসে করা যাবে না। সেই কাজগুলো সম্পর্কে নিচে উল্লেখ করা হলো।

 

১) রমজানে ইফতার করতে দেরি করা

অনেকের মধ্যে এই ধারণা রয়েছে যে, বিলম্বে ইফতার করলে কোন সমস্যা হয় না। আপনাকে মনে রাখতে হবে যে, আল্লাহর রাসূল (সাঃ) দেরিতে ইফতার করতে নিষেধ করেছেন।

তাই সঠিক সময়ে ইফতার করতে হবে। সময়মতো দ্রুত ইফতার করলে উম্মাহ কল্যাণের ভিতর থাকবেন এমনটাই হাদিস থেকে জানা যায়।

 সবথেকে বড় কথা হচ্ছে ইফতার করার হুকুম নির্দিষ্ট সময়ে দেওয়া হয়েছে।তাই সঠিক সময়ে ইফতার করতে হবে। বিলম্ব করা যাবে না।

রোজায় ইছবগুল ও তোকমা দানা খাবেন কিভাবে?

মাহে রমজানের সেহরি ও ইফতারের সময়সূচি

রোজার নিয়ত কিভাবে করবেন? ইফতারের দোয়া উচ্চারণসহ শিখুন


২) সেহরি না খেয়ে রোজা রাখা

সেহরি হচ্ছে একটি বরকতময় খাবার। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) সেহরি খেতে সাহাবিদের উদ্বুদ্ধ করেছেন। তাই কোন কারণে সেহরি খেতে না পারলে অন্তত অল্প কিছু হলেও খাওয়া উত্তম।

যেহেতু আল্লাহর রসূল (সাঃ) সেহরি খেতে উৎসাহিত করেছেন তাই এই বরকতময় খাবার থেকে রিতর থাকবেন না।


৩) কেনা-কাটায় নিজে ব্যস্ত রাখা

রমজান মাসের প্রতিটি মুহূর্ত অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ । বছরের শুধুমাত্র একটি মাস একবারই আসে। তাই রমজান মাসের সময় যেন কোনভাবে হেলায়-খেলায় নষ্ট হয়ে না যায়, সেই দিকে সর্বাত্মক খেয়াল রাখা জরুরী।

অনেকে রমজানের শেষ দিনগুলোতে কেনা-কাটায় মেতে ওঠেন, এটা ঠিক নয়। রমজানের শেষদিনগুলো অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ ।

পবিত্র কুরআন রমজান মাসে অবতীর্ণ হয়েছে শেষগুলোর একদিন ক্বদর রত্রিতে। তাই শেষদিনগুলোতে এমন থাকা চাই যে, যাতে সর্বদা ভাল কাজে সময় ব্যায় হয়। ইবাদত বন্দেগীতে মগ্ন থাকা উত্তম।


৪) মিথ্যা বলা ও অন্যান্য খারাপ কাজ বা পাপ কাজ করা

মিথ্যা সর্বদা মানুষকে বিপদে ফেলে দেয়। সত্য মুক্তি দেয় এবং মিথ্যা ধ্বংস ডেকে আনে প্রবাদটি যথাযথই মূল্যায়ণ করতে পারি না। জীবনের সর্ব ক্ষেত্রে সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করা মুসলমানদের একান্ত কর্তব্য।

সকল ধরণের পাপ কাজ থেকে দূরে থাকা মুমিনের আসল পরিচয়। পাপ কাজ থেকে দূরে থাকা একজন মুমিনের দৈনন্দিন কাজ। তবুও রমজান মাসে এই বিষয়ে বেমি সতর্ক থাকতে হবে যাতে কোনভাবেই পাপ কাজ সংঘটিত না হয়।


৫) অপচয় ও অপব্যয় করা

অপচয় কারীকে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা শয়তানে ভাই উল্লেখ করেছেন। কেননা অপচয় কিংবা অপব্যয় করা খুবই বাজে ও গর্হিত অভ্যাস। এই অভ্যাস মানুষকে ধ্বংস করে ফেলে।

আল্লাহ তার প্রিয় বান্দাদের পবিত্র কুরআন ও হাদিসের অসংখ্য স্থানে অপচয় করতে নিষেধ করা হয়েছে। তবে এখানে মনে রাখতে হবে যে, অপচয় রোধ করতে গিয়ে যেন কৃপণতা না হয়।

ইসলামে অপচয় করা যেমন নিষেধ তেমনি কৃপণতা করাও নিষেধ। আল্লাহ তায়ালা কৃপণতাকে পছন্দ করেন না। তাই অপচয় ত্যাগ করার অর্থ হচ্ছে মাধ্যম পন্থা অবলম্বন করা।


৬) পবিত্র কুরআনের হক আদায় না করে খতম করা

কুরান তেলাওয়াত করা অনেক গুরুত্বপূর্ণ এবং ফজিলতপূর্ণ কাজ। তাই রমজান মাসে পবিত্র কুরআনের অর্থসহ বুঝে বুঝে খতম করা কিংবা তেলাওয়াত করা উত্তম।

মনে রাখবেন, কুরআন তেলাওয়অতের সময় যেন কুরআনের হক নষ্ট না হয়। তাড়াহুরা বা অসুন্দরভাবে খতম করলে সওয়াব না হয়ে বরং গোনাহগার হতে হবে। তাই সহিহ ও সুন্দরভাবে কুরআন তেলাওয়াত করতে হবে।

এখানে আরো লক্ষণীয় বিষয় যে, কুরআণের নির্দেশনাগুলোর প্রতি বিশেষ নজর দিতে হবে যেন সেগুলো বাস্তাব জীবণে প্রতিফলন তথা আমল করা যায়।


৭) জামাতের সাথে ফরজ আদায়ে অলসতা করা

নামায সব ইবাদতের মূলকেন্দ্র। রমজান মাসে রোজাদাররা সকল কাজ স্থগিত রেখে দূরদূরান্ত থেকে নামাজের সময় মসজিদ অভিমুখে যাত্রা করেন। দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মসজিদে সমবেত হয়ে জামাতে নামাজ আদায় করে থাকেন।

মুসল্লিরা মসজিদে এভাবে জামাতের সাথে নামাজ আদায় করলে তাদের পরস্পরের মধ্যে ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে ওঠে। এছাড়াও জামাতে নামাজ আদায় করলে ২৭গুণ বেশি সওয়াব পাওয়া যায়।

তাই আপনাকে সতর্ক থাকতে হবে যেন নামাজ জামাতে আদায়ে অলসতা তৈরি না হয়।


৮) বেশি পরিমানে খানা খাওয়া

সেহরি কিংবা ইফতারে এমন খাবার গ্রহণ করা উচিয় নয়, যা পরবর্তীতে স্বাস্থ্যের উপর বিরুপ প্রভাব ফেলে। আবার এমন কম খাবারও উচিৎ নয় যে, রোজা রাখতে অসুবিধা হয়।

এটা এজন্য যে, ইসলামে স্বাস্থ্য সচেতনাও অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আল্লাহর ইবাদত সঠিকভাবে আদায় করার জন্য শক্তি ও স্বাস্থ্য অতি প্রয়োজনীয় বিষয়।

অসুস্থ্য মুমিন অপেক্ষা সুস্থ্য-সবল মুমিন আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়।

 

৯) রিয়া বা লোক দেখানোর জন্য ভাল কাজ বা ইবাদত করা

রিয়া হচ্ছে লোকদেখানো ও আত্নপ্রদর্শনকারী কাজ বা আমল। ইসলামের দৃষ্টিতে রিয়া করা সম্পূর্ণরুপে হারাম বা নিষিদ্ধ। যে গুণাহ আল্লাহ তায়ালা কখনই ক্ষমা করেন না তা হচ্ছে শিরক করা।

শিরক হচ্ছে দুই প্রকার তথা শিরকে আকবর বা বড় শিরক এবং শিরকে আসগার বা ছোট শিরক। আর রিয়া হলো ছোট শিরক। তাই রিয়া থেকে অবশ্যই বেচে থাকতে হবে।


১০) অধিক পরিমানে ঘুমানো

অনেকেই মনে করে থাকেন যে, যত বেশি ঘুমানো যায় শরীর তত ভাল থাকে এই ধারণা ভুল। কেননা বেশি বেশি ঘুমানোর ফলে শরীরে নানা রকম সমস্যা তৈরি হয়।

একজন সুস্থ ও প্রাপ্ত বয়ষ্ক মানুষের জন্য প্রতিদিন সাত ঘন্ট ঘুম যথেষ্ট। তাই বেশি বেশি ঘুমানো থেকে বিরত থাকতে হবে। আমরা জানি অতিরিক্ত কোনকিছুই ভালো নয়, ঘুমও এর ব্যাতিক্রম নয়।

বেশি ঘুম মাথাব্যাথা, পিঠেব্যাথার কারণ ছাড়াও বেশি বেশি ঘুমালে দেখা দিতে পারে ডায়াবেসিসের মতো অসুখও। বেশি ঘুম হতে ডিপ্রেশনেরও কারণ। তাই ঘুমের ব্যাপারে আপনাকে সচেতন থাকতে হবে।


১১) পণ্যের দাম বাড়াতে সংকট তৈরি করা বা ভূমিকা রাখা

ভোক্তাদের জিম্মি করা ইসলামে জায়েজ নাই। কেউ যদি সংকট তৈরি করে “বিত্তশালী” হয়ে যায় তাহলে তার কোন লাভ হবে না। তার অবৈধ সম্পদ জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হয়ে যাবে।

শুধু তাই নয়, দুনিয়ার জীবনও তার জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়াবে। উপরন্ত উপার্জন হারাম হওয়ার কারণে তার নামাজ, রোজা, হ্বজ, দান-সদকা কোনকিছুই কবুল হবে না।

মজুদদারি ও কৃত্রিম সংকট তৈরির মাধ্যমে কোটিপতি হলেও তার জন্য দারিদ্র্যতা অবধারিত। আল্লাহর কাছে কোটিপতির কোন মূল্য নেই। আপনি যদি এই কাজে ভুমিকা রাখেন তবুও গোনাহগার হবেন।


১২) অশ্লীল ছবি নাটক ইত্যাদি দেখা

এখনকার যুগে সব রকম নাটকের পূর্ণতা নারীদের ছাড়া হয় না। তাই বর্তমানে নাটকগুলো নারীদের দিয়ে সাজানো হয়ে থাকে। আর ইসলামে নারীদের দেখা স্পষ্ট হারাম।

এই সকল নাটকের উদ্দেশ্য শিক্ষা, ইসলাম প্রচার কিংবা উপদেশ গ্রহণ নয়। বরং খেল-তামশা ও অবৈধ আনন্দ উপভোগ করার জন্য এগুলো করা হয়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে এসব নাটক ইসলামকে নিরুৎসাহিত করে।

অতএব, একজন মুমিনের জন্য এই সকল নাটক থেকে বেঁচে থাকা অত্যান্ত জরুরী। রমজান মাসে এসব নাটক আপনার রোজাকে ধ্বংস করে দিতে পারে।


১৩) বেহুদা কাজে রাত জেগে থাকা

হাদিসে দেরি করে ঘুমাতে নিষেধ করা হয়েছে। নবীজি (সাঃ) এশার নামাজের পর গল্পগুজব ও গভীর রাত জেঁগে থেকে সময় নষ্ট না করে তাড়াতাড়ি ঘুমানোর জন্য তাগিত দিতেন।

তবে গুরুত্বপূর্ণ ও কল্যাণজনক কারণে রাত জাগতে নিরুৎসাহিত করা হয় নাই। তাই গুরুত্বপূর্ণ ও কল্যাণকর কাজে রাত জাগতে বাঁধা নেই।

মনে রাখবেন, অযথা গল্প-গুজব, অহেতুক নেট ব্রাউজিং  ও গুরুত্বহীন কাজে সময় নষ্ট করা উচিৎ হবে না। বরং তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়া জরুরী।


১৪) দুনিয়াবী কাজে ব্যস্ততায় মগ্ন থাকা

ভালো কাজ  তথা বেশি বেশি ইবাদত করার মাস হচ্ছে রমজান মাস। এই মাসে বেশি বেশি আমল করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আমরা অনেকেই দুনিয়াবি কাজে অধিক ব্যস্ত থাকি, এটা কাম্য নয়।

এ মাসে ভালো কাজের পাশাপাশি বেশি বেশি দোয়া- ইস্তেগফার করা উচিৎ। আমরা জেনেছি যে, এই মাসে কেউ যদি গোনাহ ক্ষমা করে নিতে না পারে তাহলে সে খুবই হতভাগা।

হাদিসে এসেছে, ‘ইফতার মূহূর্তে আল্লাহ তাআলা বহু মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে থাকেন। মুক্তির এই প্রক্রিয়া রমজানের প্রতি রাতেই চলতে থাকে।’ (জামিউস সাগির, হাদিস: ৩৯৩৩)


১৫) বিদআদ করা

বিদআদ কি? এই বিষয়ে বিস্তারিত জানা জরুরী। কেননা বিদআদ সম্পর্কে রাসূল (সাঃ) কঠোর হুশিয়ারি দিয়েছেন। একজন মুমিনকে বিদআদ থেকে সর্বদা বেচে থাকতে হবে।

ইসলামিক পরিভাষায় বিদআদ হচ্ছে, দ্বিনের মধ্যে এমন বিষয় সৃষ্টি করা, যা রাসূলুল্লাহ সাঃ ও সাহাবায়ে কেরামের যুগে ছিল না; বরং পরে তা উদ্ভাবন করা হয়েছে।

হাদিস থেকে জানা যায় বিদআদ মানুষকে জাহান্নামে নিয়ে যাবে। এছাড়াও কিয়ামতের দিন বিদআদকারী চরমভাবে লাঞ্ছিত হবে। তাই সকলকে বিদআদ থেকে দূরে থাকতে হবে।

কোন মন্তব্য নেই:

Blogger দ্বারা পরিচালিত.