Home BD Infoনাগরিক সেবা, ব্যাংকিং ও প্রযুক্তির বাংলা গাইড

ASYCUDA World কী ও কীভাবে কাজ করে? বাংলাদেশের কাস্টমস প্রক্রিয়া

আমদানি বা রপ্তানির কাগজপত্রে "ASYCUDA" শব্দটি আপনি হয়তো বহুবার দেখেছেন, কিন্তু এটি আসলে কী, কারা চালায় এবং ব্যবসার কাজে কীভাবে লাগে, তা অনেকের কাছেই পরিষ্কার নয়। এই লেখায় সহজ ভাষায় জানাব ASYCUDA World-এর পরিচয়, বাংলাদেশে এর ব্যবহার, কারা এর সাথে কাজ করেন এবং আমদানি পণ্য খালাসের সাধারণ ধাপগুলো।

ASYCUDA World কী ও কীভাবে কাজ করে? বাংলাদেশের কাস্টমস প্রক্রিয়া
সংক্ষেপে উত্তর: ASYCUDA (Automated System for Customs Data) হলো জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা UNCTAD-এর তৈরি কম্পিউটারভিত্তিক কাস্টমস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম। এর সর্বশেষ প্রজন্মের নাম ASYCUDA World। বাংলাদেশে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও কাস্টমস হাউসগুলো এটি দিয়ে কার্গো ম্যানিফেস্ট, বিল অব এন্ট্রি বা এক্সপোর্ট এবং শুল্ক-করের হিসাব সামলায়।

ASYCUDA কী এবং কে তৈরি করেছে?

ASYCUDA-এর পূর্ণরূপ Automated System for Customs Data। এটি UNCTAD-এর সবচেয়ে বড় কারিগরি সহায়তা কর্মসূচি, যা চার দশকের বেশি সময় ধরে উন্নয়নশীল দেশগুলোর কাস্টমস প্রক্রিয়া ডিজিটাল করতে সাহায্য করছে। বর্তমানে একশোর বেশি দেশ বা অর্থনীতি এটি ব্যবহার করে।

সিস্টেমটির নতুন সংস্করণগুলোতে ঝুঁকি বিশ্লেষণের (risk management) সুবিধাও আছে। এতে ঘোষণাপত্রের পুরোনো তথ্য বিশ্লেষণ করে ঝুঁকিপূর্ণ চালান চিহ্নিত করা যায়, ফলে কাস্টমস কর্মকর্তারা সব চালান না খুলে সন্দেহজনক চালানে বেশি নজর দিতে পারেন।

asycuda.org ওয়েবসাইটটি আসলে কীসের?

asycuda.org হলো ASYCUDA কর্মসূচির তথ্যভিত্তিক ওয়েবসাইট। এখানে পাবেন কর্মসূচির খবর, ব্যবহারকারী দেশগুলোর কেস স্টাডি এবং বিভিন্ন প্রকাশনা। বাংলাদেশের জন্য প্রকাশিত একটি কেস স্টাডিও সেখানে আছে।

তবে এই সাইটে লগইন করে বাংলাদেশের বিল অব এন্ট্রি জমা দেওয়া যায় না। প্রতিটি দেশ নিজের কাস্টমস কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সিস্টেমটি চালায়। বাংলাদেশে সেই কাজ হয় বাংলাদেশ কাস্টমসের নিজস্ব ব্যবস্থায়, অনুমোদিত ইউজার আইডি দিয়ে। কাস্টমস পোর্টালের ব্যবহার, শুল্ক ক্যালকুলেটর ও ব্যাগেজ রুলস নিয়ে বিস্তারিত পড়তে পারেন আমাদের বাংলাদেশ কাস্টমস পোর্টাল ব্যবহার নির্দেশিকা লেখায়।

বাংলাদেশে ASYCUDA World: কিছু বাস্তব তথ্য

একসময় বাংলাদেশ ASYCUDA++ ব্যবহার করত, পরে ASYCUDA World-এ উত্তরণ ঘটে। UNCTAD-এর ২০২২ সালের প্রকাশনা অনুযায়ী:

  • ২০২১ সালে বাংলাদেশে ৩৯ লাখের বেশি ঘোষণাপত্র (declaration) প্রক্রিয়া হয়েছে, ২০১৭ সালে যা ছিল প্রায় ৩২ লাখ।
  • ২০২১ সালে ২৫ হাজারের বেশি ম্যানিফেস্ট জমা পড়েছে, ২০১৭ সালে ছিল প্রায় ১৪ হাজার।
  • ওই বছর আমদানির ৮২ শতাংশ ঘোষণাপত্রের মূল্যায়ন তিন দিনের মধ্যে শেষ হয়েছে।
  • ২০১৭ থেকে ২০২১ সালে রাজস্ব আদায় গড়ে বছরে প্রায় ১১ শতাংশ বেড়েছে।

উৎস: ASYCUDA Compendium 2022 – Bangladesh। সংখ্যাগুলো ওই প্রকাশনার সময়কালের, বর্তমান চিত্র আলাদা হতে পারে।

এ ছাড়া এনবিআর সিস্টেমটিকে ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো (NSW) এবং অন্যান্য সরকারি সংস্থার সাথে যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে, যাতে একই তথ্য বারবার আলাদা অফিসে জমা দিতে না হয়।

কারা ASYCUDA World-এর সাথে কাজ করেন?

  • আমদানিকারক ও রপ্তানিকারক: পণ্যের বিল অব এন্ট্রি বা বিল অব এক্সপোর্টের অবস্থা জানা ও ডকুমেন্ট ঠিক রাখা।
  • সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট: ক্লায়েন্টের পক্ষে কাস্টমস ঘোষণা তৈরি ও জমা দেওয়া।
  • শিপিং এজেন্ট ও ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার: ইলেকট্রনিক কার্গো ম্যানিফেস্ট (IGM/EGM) জমা দেওয়া।
  • কাস্টমস কর্মকর্তা: ঘোষণার মূল্যায়ন, শুল্ক-কর নির্ধারণ ও খালাসের অনুমোদন।
  • গবেষক ও বিশ্লেষক: প্রকাশিত বাণিজ্য পরিসংখ্যান ও নীতিগত প্রতিবেদন নিয়ে কাজ করা।

ASYCUDA World ব্যবহারের প্রধান সুবিধা

  1. কাগজের ব্যবহার কম: ম্যানিফেস্ট ও ঘোষণা অনলাইনে জমা হয়, ফাইল ঘোরাঘুরি কমে।
  2. দ্রুত মূল্যায়ন: শুল্ক-কর হিসাব সিস্টেমেই হয়, ম্যানুয়াল ভুলের সুযোগ কমে।
  3. স্বচ্ছতা: প্রতিটি ধাপের রেকর্ড থাকে, মানুষের সরাসরি হস্তক্ষেপ কমে।
  4. ঝুঁকিভিত্তিক যাচাই: সব চালান নয়, ঝুঁকিপূর্ণ চালানে বেশি নজর।
  5. অবস্থা জানা: ঘোষণাপত্র কোন ধাপে আছে, তা অনলাইনে দেখা যায়।

মনে রাখবেন, কার্যকারিতা অনেকটা নির্ভর করে আমদানিকারকের ডকুমেন্ট প্রস্তুতি ও সময়মতো বিল জমা দেওয়ার ওপর। সিস্টেম থাকলেই খালাস আপনা-আপনি দ্রুত হয় না।

আমদানি পণ্য খালাসের সাধারণ ধাপ

নিচের ধাপগুলো একটি সাধারণ চিত্র। কাস্টমস হাউস বা পণ্যের ধরনভেদে নিয়মে পার্থক্য থাকতে পারে, তাই কাজ শুরুর আগে আপনার সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট বা সংশ্লিষ্ট কাস্টমস হাউস থেকে হালনাগাদ নিয়ম জেনে নিন।

ধাপ ১: প্রয়োজনীয় নিবন্ধন ও লাইসেন্স গুছিয়ে নিন

আমদানির জন্য সাধারণত আইআরসি, বিআইএন (ভ্যাট নিবন্ধন), টিআইএন ও ট্রেড লাইসেন্স লাগে। বিস্তারিত দেখুন:

নতুন ব্যবসা শুরু করলে RJSC কোম্পানি রেজিস্ট্রেশনের গাইড এবং BIDA OSS পোর্টালের সেবাগুলো কাজে লাগতে পারে।

ধাপ ২: ঋণপত্র (LC) ও ব্যাংকিং

বেশিরভাগ আমদানিতে ব্যাংকের মাধ্যমে এলসি খোলা হয়। এলসি কী ও কীভাবে করবেন, তা জানতে পড়ুন LC (Letter of Credit) গাইড।

ধাপ ৩: ম্যানিফেস্ট জমা

পণ্য বন্দরে পৌঁছানোর আগে বা পরে শিপিং এজেন্ট ইলেকট্রনিক কার্গো ম্যানিফেস্ট সিস্টেমে জমা দেন।

ধাপ ৪: বিল অব এন্ট্রি জমা

আমদানিকারক বা তাঁর সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ইনভয়েস, প্যাকিং লিস্ট, বিল অব লেডিং, এলসি ও এইচএস কোডসহ পণ্যের তথ্য দিয়ে ঘোষণাপত্র জমা দেন। এইচএস কোড ভুল হলে শুল্ক-কর হিসাব বদলে যায় এবং খালাস আটকে যেতে পারে।

ধাপ ৫: মূল্যায়ন ও যাচাই

সিস্টেম ঝুঁকির ভিত্তিতে ঘোষণাটি কোন পথে যাবে তা নির্ধারণ করে। কিছু চালান শুধু কাগজপত্র যাচাইয়ে, কিছু চালান পণ্য পরীক্ষার পর ছাড়া হয়।

ধাপ ৬: শুল্ক-কর পরিশোধ

হিসাব হওয়া শুল্ক ও কর অনুমোদিত ব্যাংক চ্যানেলে পরিশোধ করতে হয়। অনলাইনে কর দেওয়ার নিয়মের জন্য দেখুন NBR-সোনালী ব্যাংক e-Payment পোর্টালের গাইড।

ধাপ ৭: খালাস

পরিশোধ ও যাচাই শেষ হলে কাস্টমস পণ্য খালাসের অনুমতি দেয়। রপ্তানির ক্ষেত্রে অনুরূপ প্রক্রিয়ায় বিল অব এক্সপোর্ট জমা দিতে হয়।

সাধারণ মানুষ কি ASYCUDA ব্যবহার করতে পারেন?

তথ্য জানার জন্য asycuda.org সবার জন্য উন্মুক্ত। কিন্তু কাস্টমস ঘোষণা জমা দেওয়ার জন্য অনুমোদিত ইউজার আইডি লাগে, যা সাধারণত লাইসেন্সধারী সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, আমদানিকারক বা রপ্তানিকারক এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেওয়া হয়। ব্যক্তিগত আমদানি বা ভ্রমণকালীন ব্যাগেজের ক্ষেত্রে আলাদা নিয়ম আছে।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

ASYCUDA World-এর পূর্ণরূপ কী?

ASYCUDA-এর পূর্ণরূপ Automated System for Customs Data। এর সর্বশেষ প্রজন্ম ASYCUDA World নামে পরিচিত।

ASYCUDA কি বাংলাদেশের নিজস্ব সফটওয়্যার?

না। সফটওয়্যারটি UNCTAD-এর কর্মসূচি। বাংলাদেশে এনবিআর ও বাংলাদেশ কাস্টমস নিজেদের প্রয়োজনমতো এটি চালায় ও সম্প্রসারণ করে।

asycuda.org আর বাংলাদেশ কাস্টমসের পোর্টালের পার্থক্য কী?

asycuda.org বৈশ্বিক কর্মসূচির তথ্যভিত্তিক সাইট। বাংলাদেশের কাস্টমস সেবা ও নোটিশের জন্য বাংলাদেশ কাস্টমসের নিজস্ব পোর্টাল দেখতে হয়।

সরকারি অন্যান্য ফি কি ASYCUDA-তে দেওয়া যায়?

না, কাস্টমস শুল্ক-কর আর সাধারণ সরকারি ফি আলাদা বিষয়। অন্যান্য সরকারি ফি জমার পদ্ধতি জানতে পড়ুন A-Challan সিস্টেমের গাইড।

উপসংহার

ASYCUDA World বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়াকে কাগজভিত্তিক ব্যবস্থা থেকে অনেকটাই ডিজিটাল করেছে। আপনি যদি আমদানি-রপ্তানির ব্যবসা শুরু করতে চান, প্রথমে লাইসেন্স ও নিবন্ধনের কাজ গুছিয়ে নিন, তারপর একজন অভিজ্ঞ সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের সাথে কাজ করুন। এই বিষয়ে কোনো প্রশ্ন থাকলে নিচে কমেন্টে জানান।

দাবিত্যাগ: এই লেখা শুধু সাধারণ তথ্যের জন্য। শুল্ক-কর, নীতি ও পদ্ধতি সময়ে সময়ে বদলায়। সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বাংলাদেশ কাস্টমস বা এনবিআরের সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি যাচাই করুন। HomeBDInfo কোনো সরকারি সংস্থা নয়।

তথ্যসূত্র: UNCTAD – Customs software upgrade, ASYCUDA Compendium 2022 – Bangladesh

এই লেখা সাধারণ তথ্যের জন্য। সরকারি নিয়ম, ফি ও সেবা বদলাতে পারে; স্বাস্থ্য বা আইনি বিষয়ে সিদ্ধান্তের আগে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা অফিসিয়াল সূত্রে যাচাই করে নিন।

কোন মন্তব্য নেই:

Blogger দ্বারা পরিচালিত.