কিভাবে সন্তান দত্তক নেওয়া হয়? বাংলাদেশে সন্তান দত্তক নেওয়ার আইনি প্রক্রিয়া কি?

0

সন্তান দত্তক নেওয়া সারা প্রথিবী জুড়ে ব্যপক জনপ্রিয় একটি পদ্ধতি। বহুকাল আগথেকেই এই প্রক্রিয়ায় সন্তান গ্রহণ করার রেওয়াজ প্রচলিত রয়েছে। তবে বাংলাদেশে আইনগতভাবে সন্তান দত্তক নেওয়ার কোন বিধান নেই। দত্তক গ্রহণের মাধমে নিঃসন্তান দাম্পত্তি সন্তান পেয়ে যান আর একটি এতিম, অনাথ কিংবা পরিত্যাক্ত শিশু পায় একটা পরিবার। বাংলাদেশের আইনে দত্তক নেওয়ার বিধান না থাকলেও এটি কিন্তু থেকে নেই। আজকের ইনফোতে “কিভাবে সন্তান দত্তক নেওয়া হয়? বাংলাদেশে সন্তান দত্তক নেওয়ার আইনি প্রক্রিয়া কি?” কিংবা বাংলাদেশে বৈধভাবে সন্তান দত্তক নেওয়ার উপায় কি? দত্তক নেওয়ার জন্য কারা উপযুক্ত? ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা করা হবে।

কিভাবে সন্তান দত্তক নেওয়া হয়? বাংলাদেশে সন্তান দত্তক নেওয়ার আইনি প্রক্রিয়া কি?

বাংলাদেশ হচ্ছে মুসলিম অধ্যুষিত দেশ এবং মুসলিম আইনে সন্তান দত্তক নেওয়ার কোন বিধানা নেই, তাই চূড়ান্তভাবে বাংলাদেশে সন্তান দত্তক বা ফাইনাল অ্যাডপশন সম্পন্ন করা যায় না। তবে অভিভাবকত্ত আইনে দত্তকের বিধান রয়েছে। এই আইনে একজন ব্যক্তি কোন শিশুর দায়ভার নিতে পারে অভিভাবক হিসাবে।

বাংলাদেশে ১৯৮৫ সালের পারিবারিক আদালত আইনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি কোন শিশু অভিভাবকত্ব গ্রহণ করতে পারে। অর্থাৎ শিশুর যাবতীয় দায়ভার নিতে পারে অভিভাবক হিসাবে, পিতা-মাতা হিসাবে নয়। জেনে রাখা ভাল যে, অভিভাবকত্ব আর দত্তক এক বিষয় নয়।

সুতরাং বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী আপনি দত্তক নিতে না পারলেও একটা শিশুর দায়ভার বা চাইল্ড কাষ্টডী নিতে পারবেন। ইসলামে পালক পুত্র নেওয়াতে কোন বাধা নাই, বরং এই কাজকে সৎকাজ হিসাবে দেখা হয়।

 

কোন আইনে কিভাবে দত্তক আবেদন করবেন?

১৮৭৫ সালের মাইনরিটি অ্যাক্টের ৩ ধারা অনুযায়ী ১৮ বছরের কমবয়সী কোনো শিশুর জন্য ১৮৯০ সালের অভিভাবকত্ব ও পোষ্য (গার্ডিয়ান্স অ্যান্ড ওয়ার্ডস এ্যাক্ট) আইনের ৭ ধারা অনুযায়ী কাস্টডি নেওয়া যাবে। এই ক্ষেত্রে আপনাকে ১৯৮৫ সালের ফ্যামিলি কোর্ট অর্ডিন্যান্সের অধীনে এখতিয়ারভুক্ত পারিবারিক আদালতে আবেদন করতে হবে।

দত্তক গ্রহণ বা কাষ্টডি পওয়ার যোগ্যতা কি?

একজন মানুষ দত্তক সন্তান গ্রহণ করতে চাইলে তার কি কি যোগ্যতা থাকা প্রয়োজন তা নিচে দেওয়া হলো।

১. নিঃসন্তান দাম্পত্তি ইচ্ছে করলে পালক সন্তানের পিতামাতা হতে পারেন। এর জন্য সেই দাম্পত্তিকে মানসিক ও শারীরিকভাবে সুস্থ থাকতে হবে। এছাড়াও তাদের মাঝে পালক সন্তানকে নিজ সন্তান হিসেবে লালন-পালন করার মানসিকতা থাকতে হবে।

২. বিবাহিত কোন নারীর স্বামী মারা গেলে ও সেই নারীর দ্বিতীয় বিবাহে আগ্রহ না থাকলে তিনি পালক সন্তান লালন-পালন করতে পারবেন, যদি তার আর্থিক সচ্ছলতা ও সামাজিক স্বাচ্ছন্দ থাকে।

৩. কোন দাম্পত্তির সন্তান থাকলেও পালক সন্তান গ্রহন করতে পারবেন। যদি নিজের সন্তান বড় হয়ে যাওয়ার পর তাদের কাছে না থাকে।

৪. অবিবাহিত মহিলা যিনি বিয়ে করবেন না বলে ঠিক করেছেন কিংবা তার বিয়ের বয়সও নেই, কিন্তু আর্থিকভাবে স্বচ্ছলতা আছে, এমন মহিলা পালক সন্তান লালন-পালন করতে পারেন।

৫. সন্তান জন্মদানে অক্ষম দাম্পত্তির মধ্যে যিনি সন্তান জন্মদানে সক্ষম, কিন্তু বিবাহ বিচ্ছেদে আগ্রহী নন কিংবা দ্বিতীয় বিবাহেও আগ্রহ নেই। তিনি পালক সন্তান গ্রহণ করতে পারবেন।

৬. পালক সন্তান নিতে আগ্রহী পরিবারকে অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল হতে হবে এবং আইন অনুযায়ী দম্পত্তির বয়স কমপক্ষে ১৮ হতে হবে। তবে ৩৫-৪৫ বছর বয়সী দম্পত্তিকে বেশি অগ্রাধিকার বা বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে থাকে।


দত্তক শিশুর ধরণ বা কি ধরণের শিশুকে দত্তক নেওয়া যায়?

অনাথ/এতিম শিশু যার পিতা-মাতা বা কোন অভিভাবক বেচে নেই। যে শিশুর পিতা-মাতা আছে কিন্তু এ শিশুর প্রতিপালনে অক্ষম কিংবা পরিত্যাক্ত শিশু ইত্যাদি।

আমার ব্যক্তিগত মতামত হচ্ছে, আপনি যে শিশুকে পালক সন্তান হিসাবে লালন-পালন করবেন সেই শিশুটির ছবিসহ পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিতে পারেন। যদি শিশুটির কেউ দাবিদার থাকে তাহলে তাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন কিংবা শিশুটি লিগ্যালি ফ্রি কিনা তা নিশ্চিত হতে পারবেন। কেননা শিশুটির কেউ দাবিদার থাকলে আইনিভাবে তাকে দত্তক সন্তান হিসাবে গ্রহণ করতে পারবেন না।

 

দত্তক নেওয়ার জন্য কোথায় শিশু পাওয়া যায়?

আপনি যদি পালক সন্তান নিতে আগ্রহী হয়ে থাকেন তাহলে আপনার জন্য জানা জরুরী যে, শিশু কোথায় পাওয়া যায়? নিম্নলিখিত নিয়মে পালক সন্তান নিতে পারেন। যেভাবে পাবেন পালক সন্তান:

এক. সন্তান দত্তক প্রদান করতে ইচ্ছুক রয়েছেন এমন পিতা-মাতা বা সন্তানের অভিভাবকদের নিকট থেকে।

দুই. ছোটমনি নিবাস থেকে । বাংলাদেশে নব্য গঠিত হয় ছোট মনি নিবাস। এখানে অভিভাবকহিন, পাচার হওয়ার সময় থেকে উদ্ধার বা পরিত্যাক্ত শিশু লালন-পালন করা হয়। বর্তমানে বংপুর ও ময়মনসিংহ বাদে ছয়টি বিভাগে ছয়টি ছোট মনি নিবাস রয়েছে।

তিন. বিভিন্ন এন.জি.ও এর কাছ থেকে দত্তক শিশু গ্রহণ করতে পারেন।

 

পালক সন্তান গ্রহণের প্রক্রিয়া কি?

বিশ্বের অন্যান্য দেশের মত বাংলাদেশে দত্তক সন্তানের ক্ষেত্রে সরকারের কোন সতন্ত্র দত্তক কর্তৃপক্ষ কিংবা অ্যাডপশন এজেন্সি নেই। এই বিষয়ে সকল এখতিয়ার পারিবারিক আদালতের।

যে শিশুটিকে অ্যাডপট করবেন কিংবা কাস্টডী নিতে চান, তার বায়োলজিক্যাল প্যারেন্টস বা জন্মদাতা পিতা-মাতা কেউ যদি বেচে থাকে, তাহলে একজন আইনজীবির সাহায্য নিয়ে তাদের কাছ থেকে অনাপত্তি পত্র, অপ্রত্যাহার যোগ্য হলফনামা এবং শিশুটির জন্ম সনদ সংগ্রহ করে নোটারি পাবলিক দিয়ে সত্যায়িত করে নিতে হবে।

এরপর নির্ধারিত কোর্ট ফি দিয়ে শিশুটি যে এলাকায় বসবাস করছে , সেই এলাকা যে আদালতের স্থানীয় এখতিয়ারের মধ্যে অবস্থিত, সেই পারিবারিক আদালতে শিশুটির অভিভাবকত্বের জন্য আবেদন করতে হবে।

সরকারি শিশুমনি নিবাস বা হাসপাতাল কিংবা অভিভাবক ছাড়া কোন পরিত্যাক্ত শিশুর জন্য সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিতে পারেন এই বিবেচনায় যে, যিনি কাস্টডী নিতে চাচ্ছেন তিনি আসলে উপযুক্ত কিনা নেওয়ার জন্য । আদালত সবকিছু বিবেচনা করে ঠিক মনে করলে অভিভাবকত্ব অনুমোদন করবেন।

শিশু দত্তক নেওয়ার ক্ষেত্রে এই ধরণের প্রক্রিয়ায় অভিভাবকত্ব অনুমোদন পেতে কমবেশি ৩ মাসের মত সময় লেগে যেতে পারে। আদালত কর্তৃক অভিভাবকত্ব প্রাপ্তির পর দেশে প্রচলিত আইন অনুযায়ী পালক পিতা-মাতা সন্তানের বৈধ বা আইনগত অভিভাবক হিসেবে গন্য হইবে।


পালক সন্তানের সম্পত্তির অধিকার:

বাংলাদেশে উত্তরাধিকার বিষয়ে প্রতিটি মানুষের পারসোনাল ল অনুসরণ করা হয়ে থাকে। যেমন- মুসলিমদের ক্ষেত্রে মুসলিম শরিয়াহ ল, হিন্দুদের ক্ষেত্রে হিন্দু ধর্মীয় আইন ইত্যাদি।

মুসলিম আইনে দত্তক পুত্র নেওয়ার কোন বিধান নেই এবং পালকপুত্র হিসাবে গ্রহণ করতে কোন বাধা নেই। সুতরাং ইসলামী শরিয়াহ আইন অনুযায়ী পালক পুত্র কোন ধরণের সম্পত্তির অধিকারি হয় না। তাই বাংলাদেশে কোন মুসলিম ব্যক্তি চাইল্ড কাস্টডী নিলে বা শিশু দত্তক গ্রহণ করলে আইন অনুযায়ী ঐ শিশু বড় হয়ে কোন সম্পত্তি পাবে না।

তবে পালক পিতা চাইলে তার পালক পুত্রকে হেবা বা দান করতে পারেন। এক্ষেত্রে তার মোট সম্পত্তির তিন ভাগের এক ভাগ পালক পুত্রকে দান করতে পারবেন।

 

হিন্দু ও খ্রিষ্টানদের ক্ষেত্রে করণীয় কি?

বাংলাদেশে হিন্দু আইনে দত্তক নেওয়ার বিধান থাকলেও তার কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। হিন্দুরা আইনগতভাবে শুধু ছেলে সন্তান দত্তক নিতে পারবে। হিন্দু পরুষ বিবাহিত, অবিবাহিত কিংবা বিপত্নীক যাই হোক না কেন, সন্তান দত্তক নেওয়ার স্বাধীনতা তার রয়েছে। কিন্তু নারী হিন্দু অবিবাহিত হলে সন্তান দত্তক নিতে পারবে না।

বিবাহিত নারীদের ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা আছে। অর্থাৎ হিন্দু বিবাহিত নারীরা স্বামীর অনুমোতি ছাড়া সন্তান দত্তক নিতে পারবে না। এমনকি বিধবা হিন্দু নারী শিশু দত্তক নিতে চাইলে তাকে স্বামীর মৃত্যুর আগে দেওয়া অনুমোতি দেখাতে হবে।

খ্রিষ্টান ধর্মেও প্রতিষ্ঠানিকভাবে সন্তান দত্তক দেওয়ার কোন বিধান নেই। তাই বাংলাদেশের খ্রিষ্টানরা শুধুমাত্র শিশুর অভিভাবকত্ব নিতে পারেন।

 

ক্রস কান্ট্রি এ্যাডাপশন বা একদেশ থেকে অন্য দেশে দত্তক নিতে করণীয় কি?

একদেশ থেকে অন্য দেশে সন্তান নিতে চাইলে উভয় দেশের আইন এবং আন্তার্জাতিক আইন/বিধিমালা অনুসরণ করতে হবে। যেমন লন্ডনের কেউ বাংলাদেশে দত্তক নিতে চাইলে প্রথমে তাকে তিনি যেখানে থাকেন সেখানকার দত্তক আইন এবং বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে হবে। এরপর বাচ্চাটির পাসপোর্ট করে নিতে হবে। অত:পর শিশুটিকে যে দেশে নিয়ে যাওয়া হবে সেই দেশে ভিসার জন্য আবেদন করতে হবে।

বিশ্বব্যাপী শিশু দত্তক অর্থাৎ এক দেশ থেকে অন্য দেশে শিশু দত্তক দেওয়া নেওয়ার ক্ষেত্রটি সহজ করার লক্ষে নেদারল্যান্ড এর রাজধানী হেগ-এ- ১৯৯৩ সালে প্রণীত হয় হেগ কনভেনশন অন প্রোটেকশন অব চিলড্রেন অ্যান্ড কো-অপারেশন ইন রেসপেক্ট অব ইন্টার কান্ট্রি অ্যাডপশন (হেগ এ্যাডাপশন কনভেনশন)। তবে বাংলাদেশ এই কনভেনশনের স্বাক্ষর করেনি কিংবা অনুসমর্থন জানায়নি।

১৯৮৯ সালে গৃহীত জাতী-সংঘ শিশু অধিকার সনদ, UNCRC (United Nations Convention on the Right of Child). বাংলাদেশ এই সনদে স্বাক্ষর করলেও এই কনভেনশনে ২১ নাম্বার আর্টিকেল অর্থাৎ দত্তক গ্রহণ বিষয়ক অনুচ্ছেদে আপত্তি উত্থাপন করে।

এছাড়াও বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর war babies বা যুদ্ধ শিশুদের অভিভাবকত্ব দেবার জন্য ১৯৭২ সালে একটি দত্তক আইন করা হয়। নানা অভিযোগের কারণে ১৯৮২ সালে আইনটি বাতিল করা হয়।

ইউরোপ আমেরিকাসহ নানা দেশে এই বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা রয়েছে। বাংলাদেশ যেহেতু মুসলিম অধ্যাষিত দেশ। তাই ইসলামী শরিয়াহ মেনে এই বিষয়ে পরিস্কার আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।

 

দত্তক ছাড়াও অনেকেই সারোগেছি পদ্ধতিতে সন্তানের পিতা-মাতা হয়ে থাকেন। সারোগেছি সম্পর্কে বাংলাদেশ ও ভারতে এই বিষয়ে আইন কি? বিস্তারিত জানতে “ সারোগেসি কি? বাংলাদেশ আইনে মাতৃগর্ভ ভাড়া দেওয়া কি? সারোগেসি সম্পর্কে ইসলাম কি বলে?” ইনফোটি দেখুন।

 

শেষকথাঃ

আশাকরি এই ইনফো থেকে আপনি সন্তান বা শিশু দত্তক বিষয়ে আইনগত বিষয় জানতে পেরেছেন। এটি আপনার কাছে ভাল লাগলে সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন। আপনার মতামত, প্রশ্ন কিংবা পরামর্শ জানাতে কমেন্ট করুন।


Home BD info এর অন্যান্য ইনফো

ওরাল সেক্স করলে যে ধরণের রোগ হতে পারে ?

গর্ভবতী মায়ের খাবার তালিকা কিভাবে করবেন?

গর্ভবতী মহিলার পেটের সন্তান ছেলে না মেয়ে কিভাবে জানবেন?

কোভিড-১৯ অনলাইনে নিবন্ধন করবেন কিভাবে?

Tags

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)


#buttons=(Accept !) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Learn More
Accept !