গর্ভধারণ এড়াতে নিরাপদ দিন হিসাব কি: ক্যালেন্ডার পদ্ধতির নিয়ম ও সীমাবদ্ধতা
এই লেখাটি এক বছরের বেশি আগে হালনাগাদ হয়েছে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি বা অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে সর্বশেষ তথ্য যাচাই করে নিন।
পরিবার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে অনেক দম্পতি মাসিক চক্র হিসাব করে গর্ভধারণের সম্ভাব্য সময় আন্দাজ করেন। এই পদ্ধতিকে বলা হয় ক্যালেন্ডার পদ্ধতি বা ফার্টিলিটি অ্যাওয়ারনেস মেথড। এই লেখায় জানবেন, পদ্ধতিটি কীভাবে কাজ করে, উর্বর দিন কীভাবে হিসাব করা যায়, এর সীমাবদ্ধতা কী এবং কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
স্বাস্থ্য বিষয়ক নোট: এই লেখা সাধারণ তথ্যের জন্য, চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। আপনার জন্য কোন পদ্ধতি উপযুক্ত, তা একজন চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীর সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করুন।
ক্যালেন্ডার পদ্ধতি কীভাবে কাজ করে?
মাসিক চক্রের মাঝামাঝি সময়ে ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণু নির্গত হয়, একে বলে ডিম্বস্ফোটন (ওভুলেশন)। ডিম্বাণু সাধারণত ১২ থেকে ২৪ ঘণ্টা বেঁচে থাকে। আর শুক্রাণু নারীর প্রজননতন্ত্রে ৩ থেকে ৫ দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। তাই ডিম্বস্ফোটনের আগের কয়েকদিন এবং ডিম্বস্ফোটনের দিনটি মিলিয়ে গর্ভধারণের সম্ভাবনা থাকে। এই সময়কে বলা হয় উর্বর সময় বা ফার্টাইল উইন্ডো।
ক্যালেন্ডার পদ্ধতিতে আগের কয়েক মাসের মাসিক চক্রের দৈর্ঘ্য থেকে এই উর্বর সময় আন্দাজ করা হয়।
উর্বর দিন হিসাব করবেন কীভাবে?
ধাপ ১: অন্তত ৬ মাসের হিসাব রাখুন
প্রতিটি মাসিক শুরুর প্রথম দিনকে ১ ধরে পরবর্তী মাসিক শুরুর আগের দিন পর্যন্ত মোট দিন গুনুন। এটিই এক চক্রের দৈর্ঘ্য। ডায়েরি বা মোবাইলের পিরিয়ড ট্র্যাকার অ্যাপে অন্তত ছয়টি চক্র লিখে রাখুন।
ধাপ ২: সূত্র প্রয়োগ করুন
- উর্বর সময়ের শুরু = সবচেয়ে ছোট চক্র − ১৮
- উর্বর সময়ের শেষ = সবচেয়ে দীর্ঘ চক্র − ১১
উদাহরণ
ধরুন, ছয় মাসে সবচেয়ে ছোট চক্র ২৬ দিন এবং সবচেয়ে দীর্ঘ চক্র ৩০ দিন।
- ২৬ − ১৮ = ৮
- ৩০ − ১১ = ১৯
অর্থাৎ মাসিকের ৮ম থেকে ১৯তম দিন পর্যন্ত উর্বর সময়। এই সময় গর্ভধারণের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। গর্ভধারণ এড়াতে চাইলে এই দিনগুলোতে মিলন থেকে বিরত থাকতে হবে, অথবা কনডোমের মতো বাধা-পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে।
এই পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা
- অনিয়মিত মাসিকে অনুপযুক্ত: চক্র প্রতি মাসে অনেক বদলালে হিসাব নির্ভরযোগ্য হয় না।
- ডিম্বস্ফোটন সরে যেতে পারে: মানসিক চাপ, অসুস্থতা, ওজন পরিবর্তন, ভ্রমণ বা ওষুধের কারণে চক্র বদলে যেতে পারে।
- ব্যর্থতার হার তুলনামূলক বেশি: নিয়মিত সঠিকভাবে মানলেও ঝুঁকি থাকে, আর বাস্তবে ভুল হওয়ার সুযোগ আরও বেশি।
- যৌনবাহিত রোগ থেকে সুরক্ষা নেই: শুধু কনডোম এই ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
- সদ্য সন্তান জন্মের পর, বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় বা জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল বন্ধ করার পর চক্র অনিয়মিত থাকতে পারে, তখন এই পদ্ধতি ভরসাযোগ্য নয়।
অন্যান্য পদ্ধতির সঙ্গে তুলনা
নিচের সংখ্যাগুলো সাধারণ ব্যবহারে এক বছরে প্রতি ১০০ জন নারীর মধ্যে আনুমানিক কতজন গর্ভবতী হতে পারেন, তার ধারণা দেয়। উৎস ও গবেষণা ভেদে সংখ্যা কিছুটা আলাদা হতে পারে।
| পদ্ধতি | আনুমানিক ব্যর্থতার হার (সাধারণ ব্যবহারে) |
|---|---|
| ক্যালেন্ডার / ফার্টিলিটি অ্যাওয়ারনেস | প্রায় ১৫ বা তার বেশি |
| পুরুষ কনডোম | প্রায় ১৩ |
| খাবার বড়ি (পিল) | প্রায় ৭ |
| ইমপ্লান্ট, আইইউডি | ১ এর কম |
তাই গর্ভধারণ এড়ানো আপনার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ হলে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে আরও নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি বেছে নেওয়াই ভালো। ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র বা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সাধারণত পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ে পরামর্শ ও সেবা পাওয়া যায়।
গর্ভধারণ করতে চাইলে সময় নির্বাচন
যাঁরা সন্তান নিতে চান, তাঁদের জন্য একই হিসাব উল্টোভাবে কাজে লাগে। হিসাব করা উর্বর সময়ে একদিন পরপর মিলিত হলে গর্ভধারণের সম্ভাবনা ভালো থাকে। প্রতিদিন মিলিত হতে হবে, এমন ধারণা সঠিক নয়, কারণ শুক্রাণু ৩ থেকে ৫ দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকে।
নিয়মিত চেষ্টার পরও এক বছরের মধ্যে গর্ভধারণ না হলে (বয়স ৩৫ বছরের বেশি হলে ৬ মাস পর) স্বামী-স্ত্রী দুজনেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
জরুরি অবস্থায় করণীয়
অনিরাপদ সময়ে মিলনের পর গর্ভধারণ এড়াতে চাইলে জরুরি জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি আছে, যা যত দ্রুত সম্ভব নিতে হয়। কোনটি আপনার জন্য নিরাপদ ও কতদিনের মধ্যে কার্যকর, তা জানতে দ্রুত ফার্মাসিস্ট বা চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন। মাসিক পিছিয়ে গেলে ঘরে প্রেগনেন্সি কিট দিয়ে পরীক্ষা করে দেখতে পারেন।
সাধারণ প্রশ্নোত্তর
মাসিকের কোন সময়টি সবচেয়ে নিরাপদ?
কোনো সময়ই শতভাগ নিরাপদ নয়। ডিম্বস্ফোটনের সময় মাসে মাসে বদলাতে পারে। মাসিক চলাকালীন বা তার ঠিক পরেও, বিশেষ করে ছোট চক্রে, গর্ভধারণ হতে পারে।
এই পদ্ধতি কি সবার জন্য?
না। নিয়মিত মাসিক (সাধারণত ২৬ থেকে ৩২ দিনের চক্র) থাকলে এবং সঙ্গী উর্বর সময়ে নিয়ম মানতে রাজি থাকলেই কেবল এটি বিবেচনা করা যেতে পারে।
পিল বা অন্য ওষুধ নিয়ে সমস্যা থাকলে কী করব?
নিজে থেকে ওষুধ বেছে না নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। বয়স, স্বাস্থ্যের অবস্থা ও অন্যান্য ওষুধের ওপর নির্ভর করে উপযুক্ত পদ্ধতি আলাদা হয়।
শেষ কথা
ক্যালেন্ডার পদ্ধতি সহজ ও খরচবিহীন হলেও এর নির্ভরযোগ্যতা সীমিত। পরিকল্পিত পরিবার গড়তে সঠিক তথ্য জানা এবং প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
আরও পড়ুন
- বাসায় প্রেগনেন্সি কিট দিয়ে গর্ভাবস্থা পরীক্ষা করবেন কীভাবে?
- গর্ভধারণের প্রথম সপ্তাহের লক্ষণ
- গর্ভাবস্থা পরীক্ষার ফল ভুল হয় কেন?
- গর্ভবতী মায়ের খাবারের তালিকা
তথ্যসূত্র
এই লেখা সাধারণ তথ্যের জন্য। সরকারি নিয়ম, ফি ও সেবা বদলাতে পারে; স্বাস্থ্য বা আইনি বিষয়ে সিদ্ধান্তের আগে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা অফিসিয়াল সূত্রে যাচাই করে নিন।
৮টি মন্তব্য:
পিল খাওয়ার পরে কি বাচ্চা হওয়ার সম্ভাবনা আছে প্রথম দিনেই সহবাস করছিলাম এক সপ্তহ পর আমার স্ত্রীর মাসিক হইছে এখন জানুয়ারির প্রথম দিক দিয়া হইছে এখন পর্যন্ত হয় নাই
উত্তরমুছুনসাধারণত পিল খাওয়ার নিয়ম সঠিক না হলে তার কার্যকারিতা কমে যায়। আপনি নিশ্চিত হওয়ার জন্য ডাক্তারের পরামর্শ নিতে পারেন।
মুছুনআচ্ছা এখন বাচ্চা নিতে চাচ্ছি না,সেজন্য কোন পিল ব্যবহার করতে হবে? আর সেই পিলের নামটা বললে ভালো হতো।
উত্তরমুছুনএই বিষয়ে কোন অভিজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিতে পারেন। কোন পিল ভালো সেই বিষয়ে আমাদের কোন গবেষণা নেই। তাই আমরা বলতে পারছি না কোন পিল আপনার জন্য ভালো হবে।
মুছুনধরা যেতে পারে মাসিকের মধ্যবর্তী(10-20)সময়ে যদি সহবাস করা হয়।তাহলে বাচ্চা নিতে কোন অসুবিধা নেই।
উত্তরমুছুনএটি আপনার ডাক্তার ভালো বলতে পারবেন। ব্যাক্তিগত বিষয় পাবলিক প্লেসে না শেয়ার করাই ভালো।
মুছুনবাচ্চা হওয়ার দের মাস পর কি সহবাস করলে কোন সমস্যা হবে বা আবার প্রেগনেন্ট হবে নাকি
উত্তরমুছুনএই বিষয়ে আপনার ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করুন। সাধারণত কোন সমস্যা নেই যদি অন্য কোন শারিরিক সমস্যা না থাকে। অন্য কোন সমস্যা আছে কিনা এই বিষয়ে আপনার ডাক্তার ভালো বলতে পারবেন। তাই যে কোন স্বাস্থ্যগত বিষয়ে ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া অত্যান্ত জরুরী।
মুছুন