শারীরিক সম্পর্কের ইচ্ছা কমে যায় কেন? কিংবা কি কি কারণে শারীরিক সম্পর্কের ফাটল ধরে?
এই লেখাটি এক বছরের বেশি আগে হালনাগাদ হয়েছে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি বা অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে সর্বশেষ তথ্য যাচাই করে নিন।
দাম্পত্য জীবনে শারীরিক ঘনিষ্ঠতার আগ্রহ সময়ের সঙ্গে কমবেশি হওয়া খুব সাধারণ ব্যাপার। কিন্তু আগ্রহ দীর্ঘদিন কমে থাকলে অনেক দম্পতির মধ্যে দূরত্ব, অভিমান ও অশান্তি তৈরি হয়। অথচ এর পেছনে প্রায়ই সম্পর্কের টানাপোড়েন, মানসিক চাপ, ঘুমের অভাব, হরমোন বা কোনো শারীরিক সমস্যা কাজ করে, যার বেশিরভাগেরই সমাধান আছে। এই লেখায় জানবেন প্রধান কারণগুলো, নিজে কী করতে পারেন এবং কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন।
স্বাস্থ্য বিষয়ক নোট: এই লেখা সাধারণ তথ্যের জন্য, চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। দীর্ঘদিন সমস্যা থাকলে বা এর কারণে মন খারাপ থাকলে বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলুন।
আগ্রহ কমে যাওয়া কি স্বাভাবিক?
যৌন আগ্রহ সবার একরকম নয় এবং জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে বদলায়। সন্তান জন্মের পর, কর্মব্যস্ত সময়ে, অসুস্থতায়, বয়স বাড়ার সঙ্গে বা মেনোপজের সময় আগ্রহ কমতে পারে। এটি অসুখ নয়। সমস্যা হলো তখনই, যখন দীর্ঘদিন আগ্রহ কম থাকে এবং এতে আপনি নিজে বা আপনার সঙ্গী কষ্ট পান বা সম্পর্কে প্রভাব পড়ে।
সম্পর্ক, মন ও জীবনযাপনজনিত কারণ
১. সম্পর্কের টানাপোড়েন
ঘন ঘন ঝগড়া, কথা বন্ধ থাকা, অমীমাংসিত অভিমান বা আস্থার ঘাটতি শারীরিক ঘনিষ্ঠতার ইচ্ছা কমিয়ে দেয়। মন যখন দূরে থাকে, শরীর কাছে আসতে চায় না।
২. মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও বিষণ্ণতা
কাজের চাপ, আর্থিক দুশ্চিন্তা, পারিবারিক সমস্যা, উদ্বেগ বা বিষণ্ণতা যৌন আগ্রহ কমানোর অন্যতম বড় কারণ। নিজের শরীর নিয়ে অস্বস্তি (বডি ইমেজ) বা আত্মবিশ্বাসের অভাবও এর পেছনে থাকে।
৩. ঘুমের অভাব ও ক্লান্তি
পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীর ও মন ক্লান্ত থাকে, হরমোনের ভারসাম্যও নষ্ট হয়। ঘুমের সমস্যা থাকলে পড়ুন: অনিদ্রা ও দ্রুত ঘুমানোর উপায়।
৪. অ্যালকোহল, ধূমপান ও অলস জীবনযাত্রা
অতিরিক্ত অ্যালকোহল ও ধূমপান রক্তসঞ্চালন ও হরমোনের ওপর খারাপ প্রভাব ফেলে এবং যৌন কার্যক্ষমতা ও আগ্রহ দুটোই কমাতে পারে। ব্যায়ামের অভাব ও অতিরিক্ত ওজনও আগ্রহ কমায়। ধূমপান ছাড়তে চাইলে পড়ুন: ধূমপান ছাড়ার উপায়।
শারীরিক, হরমোন ও ওষুধজনিত কারণ
১. হরমোনের পরিবর্তন
- পুরুষদের: টেস্টোস্টেরন হরমোনের মাত্রা কমে গেলে আগ্রহ কমতে পারে।
- নারীদের: সন্তান জন্ম, বুকের দুধ খাওয়ানো ও মেনোপজের সময় ইস্ট্রোজেন কমে আগ্রহ কমতে এবং যোনিপথ শুষ্ক হয়ে অস্বস্তি হতে পারে।
- থাইরয়েডের সমস্যাও উভয়ের ক্ষেত্রে আগ্রহ কমাতে পারে।
২. দীর্ঘমেয়াদি রোগ
ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, কিডনি বা লিভারের সমস্যা, দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, স্থূলতা ও ঘুমের শ্বাসকষ্ট (স্লিপ অ্যাপনিয়া) আগ্রহের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
৩. কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
বিষণ্ণতা, উচ্চ রক্তচাপ, ঘুমের সমস্যা বা হরমোনাল জন্মনিয়ন্ত্রণের কিছু ওষুধ দীর্ঘদিন খেলে যৌন আগ্রহ কমতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজে থেকে ওষুধ বন্ধ বা বদলাবেন না। কারণ জানিয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করলে তিনি ওষুধ বা ডোজ ঠিক করে দিতে পারেন।
নিজে কী করতে পারেন?
- খোলামেলা কথা বলুন: অভিযোগ বা দোষারোপ নয়, শান্তভাবে নিজের অনুভূতি ও চাহিদা সঙ্গীকে জানান এবং তাঁর কথাও শুনুন।
- একসঙ্গে সময় কাটান: মোবাইল ও কাজের বাইরে হাঁটা, খাওয়া বা গল্পের মতো সময় রাখুন। আবেগীয় কাছাকাছি আসা শারীরিক ঘনিষ্ঠতার ভিত্তি।
- চাপ কমান: নিয়মিত বিশ্রাম, শ্বাসের ব্যায়াম, প্রার্থনা বা ধ্যান, শখের কাজ।
- ঘুম ঠিক করুন: নির্দিষ্ট সময়ে শোয়া-ওঠা, রাতে মোবাইলের ব্যবহার কমানো।
- নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম করুন: সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি ধরনের শারীরিক পরিশ্রম সুপারিশ করা হয়।
- সুষম খাবার খান: শাকসবজি, ফল, ডাল, মাছ, বাদাম ও পর্যাপ্ত পানি। কোনো একক খাবার জাদুর মতো আগ্রহ বাড়ায় না।
- অ্যালকোহল ও ধূমপান কমান বা ছাড়ুন।
- তাড়াহুড়ো না করে চাপমুক্ত থাকুন: আগ্রহ ফেরাতে চাপ দিলে হিতে বিপরীত হয়।
যে ভুলগুলো এড়িয়ে চলুন
- বাজারের "শক্তিবর্ধক" ক্যাপসুল, ট্যাবলেট, তেল বা ভেষজ পণ্য চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কিনে খাওয়া। এগুলোর অনেকটিতে অনুমোদনহীন বা লুকানো ওষুধ থাকতে পারে, যা হৃদরোগ ও রক্তচাপের রোগীদের জন্য বিপজ্জনক।
- বিজ্ঞাপন বা অনলাইনের টোটকা দেখে চিকিৎসা শুরু করা।
- সঙ্গীকে দোষ দেওয়া বা তুলনা করা।
কখন কোন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
- হঠাৎ করে আগ্রহ অনেক কমে গেলে
- কয়েক মাসের বেশি সময় ধরে সমস্যা থাকলে এবং তাতে দুজনের কষ্ট হলে
- নতুন ওষুধ শুরুর পর থেকে সমস্যা হলে
- অতিরিক্ত ক্লান্তি, ওজন বদল, মন খারাপ, ব্যথা বা ঋতুচক্রের সমস্যা একসঙ্গে থাকলে
- পুরুষদের ক্ষেত্রে উত্থানজনিত সমস্যাও থাকলে
শুরুতে মেডিসিন বা সাধারণ চিকিৎসক, নারীদের ক্ষেত্রে স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ, পুরুষদের ক্ষেত্রে ইউরোলজিস্ট এবং মানসিক চাপ বা বিষণ্ণতার ক্ষেত্রে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা কাউন্সেলরের পরামর্শ নিতে পারেন। সম্পর্কের সমস্যা বড় হলে দম্পতি কাউন্সেলিংও কার্যকর হয়।
সাধারণ প্রশ্নোত্তর
শুধু একজনের আগ্রহ কমলে কী করব?
এটি অনেক দম্পতির ক্ষেত্রেই ঘটে। দোষারোপ না করে কারণ বোঝার চেষ্টা করুন, খোলামেলা কথা বলুন এবং প্রয়োজনে একসঙ্গে চিকিৎসক বা কাউন্সেলরের কাছে যান।
বিয়ের কয়েক বছর পর আগ্রহ কমা কি স্বাভাবিক?
শুরুর উত্তেজনা সময়ের সঙ্গে বদলায়, যা স্বাভাবিক। তবে আবেগীয় ঘনিষ্ঠতা ও সময় দিলে সম্পর্কের উষ্ণতা ধরে রাখা যায়।
মানসিক চাপ কমালে কি আগ্রহ ফিরে আসে?
অনেক ক্ষেত্রেই ফেরে। চাপ, ঘুম ও সম্পর্কের সমস্যা ঠিক হলে আগ্রহও স্বাভাবিক হয়ে আসে।
শেষ কথা
যৌন আগ্রহ কমে যাওয়া লজ্জার বিষয় নয়, এটি স্বাস্থ্য ও সম্পর্কের একটি সংকেত। কারণ খুঁজে বের করে ধৈর্য ধরে সমাধান করলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উন্নতি হয়। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিতে দ্বিধা করবেন না।
তথ্যসূত্র
- NHS (যুক্তরাজ্য): Loss of libido সংক্রান্ত নির্দেশিকা
- Mayo Clinic: Low sex drive in men / Low sex drive in women
এই লেখা সাধারণ তথ্যের জন্য। সরকারি নিয়ম, ফি ও সেবা বদলাতে পারে; স্বাস্থ্য বা আইনি বিষয়ে সিদ্ধান্তের আগে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা অফিসিয়াল সূত্রে যাচাই করে নিন।

কোন মন্তব্য নেই: