Home BD Infoনাগরিক সেবা, ব্যাংকিং ও প্রযুক্তির বাংলা গাইড

কুকুর ধাওয়া করলে কী করবেন: কামড় থেকে বাঁচার ১০টি উপায়

রাস্তা দিয়ে হাঁটছেন, হঠাৎ একটা কুকুর ঘেউ ঘেউ করে তেড়ে এল। বুক ধড়ফড় করে, পা চলতে চায় দৌড়ে পালাতে। কিন্তু ঠিক এই প্রবৃত্তিই আপনাকে বিপদে ফেলতে পারে। এই লেখায় কুকুর ধাওয়া করলে কী করবেন, সেটা সহজ ধাপে দেওয়া হলো: দাঁড়ানোর ভঙ্গি, চোখের ব্যবহার, আক্রমণ করলে আত্মরক্ষা আর কুকুরের আচরণ বোঝার কিছু ইঙ্গিত। কামড় লেগে গেলে কী করবেন, সেটা আলাদা লেখায় আছে: কুকুর কামড়ালে করণীয় ও জলাতঙ্কের টিকা।

কুকুর ধাওয়া করলে কী করবেন: রাস্তায় কুকুরের আক্রমণ থেকে বাঁচার উপায়
সংক্ষেপে উত্তর: কুকুর ধাওয়া করলে দৌড়াবেন না, চিৎকারও নয়। স্থির হয়ে দাঁড়ান, সরাসরি কুকুরের চোখে তাকাবেন না, শরীরের পাশটা কুকুরের দিকে রাখুন আর ধীরে ধীরে পিছিয়ে যান। কুকুর ঝাঁপিয়ে ফেলে দিলে কুঁকড়ে বলের মতো হয়ে মাথা-ঘাড় হাত দিয়ে ঢেকে রাখুন। কামড় বা আঁচড় লাগলে সাবান-পানিতে ক্ষত ধুয়ে সেদিনই হাসপাতালে যান।

কুকুর কেন ধাওয়া করে ও কামড়ায়

সব কুকুরই কামড়াতে পারে, জাত বা আকার যা-ই হোক। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (CDC) বলছে, কুকুর বেশি কামড়ায় যখন সে ভয় পায়, নার্ভাস থাকে, খাচ্ছে বা ঘুমাচ্ছে, খেলনা বা ছানাকে রক্ষা করছে, কিংবা অসুস্থ ও ব্যথায় থাকে। অনেক সময় ছুটন্ত মানুষ বা চলন্ত জিনিস দেখলে কুকুরের তাড়া করার স্বাভাবিক প্রবৃত্তিও জেগে ওঠে। তাই আপনি দৌড় দিলে সে ধরে নেয় এটা একটা খেলা বা শিকার। এই কারণগুলোর মধ্যে বেশিরভাগই আপনি আগে থেকে এড়াতে পারেন:

  • ভয় পেলে বা চমকে গেলে: হঠাৎ কাছে গেলে বা পেছন থেকে শব্দ করলে।
  • নিজের এলাকা বা দলের সুরক্ষা: অচেনা কেউ কাছে এলে।
  • মা কুকুর ছানাকে আগলালে: ছানার কাছে যাওয়া বিপজ্জনক।
  • খাওয়া বা ঘুমের সময়: বিরক্ত করলে।
  • ব্যথা বা অসুস্থতা: এমনকি নিজের পোষা কুকুরও তখন কামড়াতে পারে।
  • খেলার ছলে: বিশেষত শিশুদের সঙ্গে খেলতে গিয়ে, যদিও কামড় খেলা নয়।

বাংলাদেশে বেওয়ারিশ কুকুরের উপদ্রবও বাড়ছে। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে ঢাকার সংক্রামক রোগ হাসপাতালের তথ্য এসেছে, যেখানে কুকুর ও বিড়ালের আক্রমণে চিকিৎসা নেওয়া মানুষের সংখ্যা ২০২৩ সালের ৯৪ হাজার থেকে ২০২৫ সালে ১ লাখ ৪৬ হাজারের বেশিতে পৌঁছেছে। হাসপাতালের কর্মকর্তারা বলছেন, বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা বাড়া এবং কুকুরের টিকাদান কর্মসূচি থমকে থাকা এর কারণগুলোর অন্যতম। তাই রাতে বা নির্জন রাস্তায় অচেনা কুকুর দেখলে বাড়তি সতর্ক থাকুন।

আক্রমণের আগে কুকুর কী ইঙ্গিত দেয়

কুকুর সাধারণত কামড়ানোর আগে কিছু সংকেত দেয়। এগুলো চিনলে আগেই সরে যেতে পারবেন। মনে রাখুন, এসব সাধারণ লক্ষণ, ব্যতিক্রমও থাকে:

  • দাঁত বের করা, গর্জন করা বা একটানা ঘেউ ঘেউ
  • শরীর শক্ত হয়ে যাওয়া, ঘাড় ও পিঠের লোম দাঁড়িয়ে যাওয়া, কান সোজা হওয়া
  • একদৃষ্টিতে আপনার দিকে তাকিয়ে থাকা
  • ভয় পেলে লেজ গুটিয়ে নেওয়া, কুঁই কুঁই করা বা ঘন ঘন হাই তোলা

লেজ নাড়ানো মানেই বন্ধুত্বের লক্ষণ নয়। দ্রুত ও শক্ত ভঙ্গিতে নাড়ালে সেটা উত্তেজনা বা সতর্কতাও হতে পারে। কুকুরটি আপনার দিকে তাকিয়ে চুপ হয়ে গেলে বা আড়ষ্ট হয়ে গেলেও সতর্ক হোন। কুকুর সবসময় আগে ঘেউ ঘেউ করে কামড়াবে, এমন ধরে নেবেন না। অনেক সময় নিঃশব্দেও আক্রমণ করে।

কুকুর ধাওয়া করলে ধাপে ধাপে করণীয়

CDC-র নির্দেশনা অনুযায়ী অচেনা কুকুর কাছে এলে এভাবে কাজ করুন:

  1. দৌড়াবেন না, চিৎকার করবেন না। দৌড়ালে কুকুরের তাড়া করার প্রবৃত্তি আরও বাড়ে। আর দুই পায়ে আপনি চার পায়ের কুকুরকে হারাতে পারবেন না।
  2. স্থির ও শান্ত থাকুন। হাত দুই পাশে রাখুন। হাত ছুড়ে বা লাঠি-ঢিল তুলে ভয় দেখাবেন না।
  3. সরাসরি চোখে চোখ রাখবেন না। কুকুর একে চ্যালেঞ্জ মনে করতে পারে। আড়চোখে কুকুরের নড়াচড়া লক্ষ রাখুন।
  4. শরীরের পাশ কুকুরের দিকে করুন। সামনাসামনি না দাঁড়িয়ে পাশ ফিরে দাঁড়ালে আপনাকে কম হুমকিস্বরূপ মনে হয়।
  5. শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বলুন। গম্ভীর স্বরে "না" বা "যাও" বলতে পারেন। চিৎকার নয়।
  6. হাত গলার কাছে আনুন। CDC বলছে, ধীরে ধীরে কনুই ভেতরে রেখে হাত গলার কাছে তুলে নিন, যাতে ঘাড় ও গলা সুরক্ষিত থাকে।
  7. কুকুর সরে গেলে বা আগ্রহ হারালে ধীরে ধীরে পিছিয়ে যান। পিঠ ঘুরিয়ে দৌড় দেবেন না। কুকুর দৃষ্টির বাইরে গেলে তবেই স্বাভাবিকভাবে হাঁটুন।

সঙ্গে ব্যাগ, ছাতা, জ্যাকেট বা সাইকেলের মতো কিছু থাকলে সেটাকে নিজের ও কুকুরের মাঝখানে রাখুন। CDC-র নির্দেশনায় পার্স, ব্যাগ বা জ্যাকেট দিয়ে বাধা তৈরির কথা আছে। কুকুরকে লাথি বা লাঠি দিয়ে মারা থেকে বিরত থাকুন, এতে সে আরও আক্রমণাত্মক হতে পারে।

কুকুর আক্রমণ করলে আত্মরক্ষা

  • ফেলে দিলে কুঁকড়ে যান। CDC বলছে, কুকুর ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলে বলের মতো গুটিয়ে যান, মাথা নিচু রাখুন, দুই হাত দিয়ে কান ও ঘাড় ঢাকুন। হাত মুঠো করে রাখলে আঙুল বাঁচে।
  • স্থির থাকুন। গড়াগড়ি বা চিৎকার করলে কুকুর আরও উত্তেজিত হতে পারে। সে শান্ত হয়ে সরে গেলে তবেই ধীরে উঠুন।
  • মুখ, ঘাড় ও গলা বাঁচান। এই জায়গাগুলোর কামড় সবচেয়ে বিপজ্জনক।
  • কিছু একটা কুকুরের মুখে দিন। ব্যাগ, জ্যাকেট বা অন্য জিনিস সামনে ধরলে কুকুর সেটাতে মনোযোগ দেয়।
  • দুই কুকুর মারামারি করলে মাঝখানে যাবেন না। CDC-ও এ বিষয়ে সতর্ক করেছে।

কামড় বা আঁচড় লাগলে: ঘটনাস্থল থেকে নিরাপদ জায়গায় সরে যান। ক্ষত সাবান ও পানিতে অন্তত ১৫ মিনিট ধুন, তারপর একই দিনে হাসপাতালে গিয়ে জলাতঙ্কের টিকার ব্যবস্থা নিন। বিস্তারিত ধাপ, কোন কামড়ে কী লাগে, বাংলাদেশে টিকা কোথায় পাবেন, সবই আছে কুকুর কামড়ালে করণীয় গাইডে। কোনো টোটকা লাগাবেন না, দেরি করবেন না।

শিশুদের শেখান

CDC বলছে, শিশুরা প্রাপ্তবয়স্কদের চেয়ে বেশি কুকুরের কামড়ের শিকার হয়, এবং শিশুদের আঘাতও প্রায়ই বেশি গুরুতর হয়। বেশিরভাগ ঘটনা ঘটে দৈনন্দিন কাজ বা চেনা কুকুরের সঙ্গে। তাই:

  • ছোট বাচ্চাদের কুকুরের সঙ্গে একা খেলতে দেবেন না, পোষা কুকুর হলেও।
  • শেখান, অচেনা কুকুরের কাছে যাওয়া বা তাকে আদর করা যাবে না। কুকুরের মালিক অনুমতি দিলে এবং কুকুরটি আগে ঘ্রাণ নিয়ে পরিচিত হলে তবেই ছোঁয়া যায়।
  • কুকুর তাড়া করলে "গাছের মতো" স্থির দাঁড়াতে শেখান: হাত শরীরের পাশে, চোখ নিচে, দৌড় নয়।
  • শেখান কুকুরকে খাওয়ার সময়, ঘুমের সময় বা ছানাদের সঙ্গে থাকার সময় বিরক্ত না করতে।
  • কামড় বা আঁচড় লাগলে লুকিয়ে না রেখে সঙ্গে সঙ্গে বড়দের জানাতে বলুন। ছোট আঁচড়েও জলাতঙ্কের ঝুঁকি থাকতে পারে।

কামড় এড়াতে প্রতিদিনের সতর্কতা

  • অচেনা কুকুরের কাছে যাবেন না, দেখতে শান্ত বা বন্ধুসুলভ মনে হলেও।
  • কুকুরকে ছুঁড়ে ঢিল মারা, তাড়া করা বা বিরক্ত করা থেকে বিরত থাকুন।
  • রাতে একা নির্জন রাস্তায় হাঁটলে সতর্ক থাকুন, হাতে মোবাইল নিয়ে একা এড়িয়ে চলুন।
  • ছানাসহ মা কুকুরের কাছ থেকে দূরে থাকুন।
  • নিজের কুকুর থাকলে নিয়মিত টিকা দিন, প্রশিক্ষণ দিন এবং বাইরে নিলে বাঁধা অবস্থায় রাখুন। CDC বলছে, কুকুরকে বাইরে শিকলে বেঁধে রাখলে সে বেশি আক্রমণাত্মক হতে পারে, তাই বেড়া দেওয়া জায়গায় রাখা ভালো।
  • পাড়ায় কুকুরের উপদ্রব বেশি হলে স্থানীয় সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদকে জানান। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন অভিযোগ এলে নির্দিষ্ট এলাকায় ব্যবস্থা নিয়েছে বলে জানিয়েছে।

WHO-র মতে, কুকুরের টিকাদানই জলাতঙ্ক প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর ও সাশ্রয়ী উপায়, আর ঘুরে বেড়ানো কুকুর মেরে ফেললে রোগ নিয়ন্ত্রণে কাজ হয় না। তাই কুকুরের প্রতি নিষ্ঠুর না হয়ে সমাজকে বেওয়ারিশ কুকুরের টিকা ও জন্মনিয়ন্ত্রণের দিকে মনোযোগী হতে হবে।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)

কুকুর ধাওয়া করলে কি দৌড় দেওয়া উচিত?

না। দৌড়ালে কুকুরের তাড়া করার প্রবৃত্তি জেগে ওঠে, আর আপনি তাকে হারাতে পারবেন না। স্থির হয়ে দাঁড়ান, চোখাচোখি এড়ান, শরীরের পাশ কুকুরের দিকে রেখে ধীরে ধীরে পিছিয়ে যান।

কুকুরের চোখের দিকে তাকানো কি বিপজ্জনক?

অচেনা বা আক্রমণাত্মক কুকুরের চোখে সরাসরি তাকালে সে সেটাকে চ্যালেঞ্জ মনে করতে পারে। তাই আড়চোখে দেখুন। CDC-ও অচেনা কুকুরের সঙ্গে সরাসরি চোখাচোখি এড়াতে বলে।

কুকুর আক্রমণ করলে কী করব?

চিৎকার বা দৌড় নয়। কুকুর ফেলে দিলে বলের মতো গুটিয়ে মাথা-ঘাড় হাত দিয়ে ঢাকুন। হাতের কাছে ব্যাগ বা জ্যাকেট থাকলে নিজের ও কুকুরের মাঝখানে রাখুন। কুকুর সরে গেলে তবে উঠুন।

কুকুর কামড়ে দিলে কী করব?

সাবান ও পানিতে ক্ষত অন্তত ১৫ মিনিট ধুয়ে একই দিনে সরকারি হাসপাতালে গিয়ে জলাতঙ্কের টিকা নিন। টোটকা লাগাবেন না। বিস্তারিত পড়ুন কুকুর কামড়ালে করণীয় লেখায়।

রাস্তায় বেওয়ারিশ কুকুরের উপদ্রব হলে কোথায় জানাব?

আপনার এলাকার সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদে জানাতে পারেন। কুকুরকে মারধর না করে টিকা ও জন্মনিয়ন্ত্রণের দাবি তোলাই সবচেয়ে কার্যকর পথ। কোন দপ্তর কীভাবে সাড়া দেয়, তা এলাকাভেদে আলাদা।

উপসংহার

কুকুর ধাওয়া করলে সবচেয়ে বড় ভুল দৌড় দেওয়া আর চিৎকার করা। স্থির থাকুন, চোখাচোখি এড়ান, পাশ ফিরে ধীরে সরে যান, আর আক্রমণ হলে মাথা-ঘাড় ঢেকে কুঁকড়ে থাকুন। শিশুদেরও এই কৌশলগুলো শেখান। কামড় বা আঁচড় লাগলে এক মুহূর্ত দেরি না করে ক্ষত ধুয়ে হাসপাতালে যান। এই বিষয়ে আপনার অভিজ্ঞতা কমেন্টে জানান, অন্যদের কাজে লাগবে।

ডিসক্লেইমার: Home BD Info কোনো চিকিৎসা বা প্রাণী-আচরণ বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠান নয়। এই লেখা সাধারণ তথ্যের জন্য। প্রতিটি কুকুর ও পরিস্থিতি আলাদা, তাই কোনো কৌশল শতভাগ কার্যকর নাও হতে পারে। কামড় বা আঁচড় লাগলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যান। জরুরি অবস্থায় ৯৯৯-এ কল করুন। সর্বশেষ হালনাগাদ: ২৮ অক্টোবর ২০২৬।

তথ্যসূত্র

এই লেখার তথ্য ২৮ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে নিচের সূত্রগুলো থেকে মিলিয়ে নেওয়া হয়েছে।

এই লেখা সাধারণ তথ্যের জন্য। সরকারি নিয়ম, ফি ও সেবা বদলাতে পারে; স্বাস্থ্য বা আইনি বিষয়ে সিদ্ধান্তের আগে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা অফিসিয়াল সূত্রে যাচাই করে নিন।

কোন মন্তব্য নেই:

Blogger দ্বারা পরিচালিত.